গদ্য

ষষ্ঠ শ্রেণি (মাধ্যমিক) - চারুপাঠ | NCTB BOOK
3.1k
Please, contribute by adding content to গদ্য.
Content

সততার পুরস্কার (প্রথম অধ্যায়) (মুহম্মদ শহীদুল্লাহ)

8.2k

সেকালে আরব দেশে তিনটি লোক ছিল- একজনের সর্বাঙ্গে ধবল, একজনের মাথায় টাক, আরেকজনের দুই চোখ অন্ধ। আল্লাহ তাহাদের পরীক্ষার জন্য এক ফেরেশতা পাঠাইলেন। ফেরেশতা হইলেন আল্লাহর দূত। তাহারা নূরের তৈয়ারী। এমনি কেহ তাহাদিগকে দেখিতে পায় না। আল্লাহর হুকুমে তাহারা সকল কাজ করিয়া থাকেন।

ফেরেশতা মানুষের রূপ ধরিয়া প্রথমে ধবলরোগীর নিকটে আসিলেন। তিনি তাহাকে বলিলেন, কী তুমি সবচেয়ে ভালোবাসো?

ধবলরোগী বলিল, আহা! আমার গায়ের রং যদি ভালো হয়। সকলে যে আমাকে বড় ঘৃণা করে।
স্বর্গীয় দূত তাহার গায়ে হাত বুলাইয়া দিলেন। তাহার রোগ সারিয়া গেল। তাহার গায়ের চামড়া ভালো হইল।
তারপর আল্লাহর দূত পুনরায় তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এখন তুমি কী চাও?
সে বলিল, আমি উট চাই।
দূত তাহাকে একটি গাভিন উট দিয়া বলিলেন, এই লও। ইহাতে তোমার ভাগ্য খুলিবে। তারপর সেই ফেরেশতা টাকওয়ালার কাছে গিয়া বলিলেন, কী তুমি সবচেয়ে ভালোবাসো?
সে বলিল, আহা! আমার এই রোগ যদি সারিয়া যায়। যদি আমার মাথায় চুল উঠে!
আল্লাহর দূত তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া দিলেন। তাহার টাক সারিয়া গেল। তাহার মাথায় চুল গজাইল। দূত পুনরায় বলিলেন, এখন তুমি কী চাও?
সে বলিল, গাভি।
তিনি তাহাকে একটি গাভিন গাই দিয়া বলিলেন, এই লও। ইহাতে তোমার ভাগ্য খুলিবে।
তারপর স্বর্গীয় দূত অন্ধের কাছে গেলেন। গিয়া বলিলেন, কী তুমি সবচেয়ে ভালোবাসো?
সে বলিল, আল্লাহ্ আমার চোখ ভালো করিয়া দিন। আমি যেন লোকের মুখ দেখিতে পাই।
স্বর্গীয় দূত তাহার চোখে হাত বুলাইয়া দিলেন। তাহার চোখ ভালো হইয়া গেল।
তারপর তিনি তাহাকে বলিলেন, এখন তুমি কী চাও?
সে বলিল, আমি ছাগল চাই।

স্বর্গীয় দূত তাহাকে একটি গাভিন ছাগল দিয়া বলিলেন, এই লও। ইহাতে তোমার ভাগ্য খুলিবে।
তারপর উটের বাচ্চা হইল, গাভির বাছুর হইল, ছাগলের ছানা হইল। এই রকম করিয়া উটে, গাভিতে, ছাগলে তাহাদের মাঠ বোঝাই হইয়া গেল।
কিছুদিন পর আবার সেই ফেরেশতা পূর্বের মতো মানুষের রূপ ধরিয়া, সেই যে আগের ধবলরোগী ছিল, তাহার নিকট উপস্থিত হইলেন।
সেখানে গিয়া তিনি বলিলেন, আমি এক বিদেশি। বিদেশে আসিয়া আমার সব পুঁজি ফুরাইয়া গিয়াছে। এখন আল্লাহর দয়া ছাড়া আমার আর দেশে ফিরিবার উপায় নাই। যিনি তোমারে সুন্দর গায়ের রং দিয়াছেন, সুন্দর চামড়া দিয়াছেন, আর এত ধনদৌলত দিয়াছেন, তাঁহার দোহাই দিয়া তোমার কাছে একটি উট চাহিতেছি।
সে বলিল, উটের অনেক দাম, কী করিয়া দিই?
স্বর্গীয় দূত বলিলেন, ওহে! আমি যেন তোমাকে চিনিতে পারিতেছি। তুমি না ধবলরোগী ছিলে, আর সকলে তোমাকে ঘৃণা করিত? তুমি না গরিব ছিলে, পরে আল্লাহ তোমাকে ধনদৌলত দিয়াছেন?
সে বলিল, না, তা কেন? এসব তো আমার বরাবরই আছে।
স্বর্গীয় দূত বলিলেন, আচ্ছা! যদি তুমি মিথ্যা বলিয়া থাক, তবে তুমি যেমন ছিলে আল্লাহ আবার তোমাকে তাহাই করিবেন।
তারপর স্বর্গীয় দূত পূর্বে যে টাকওয়ালা ছিল, তাহার কাছে গেলেন। সেখানে গিয়া আগের মতো একটি গাভি চাহিলেন। সেও ধবলরোগীর মতো তাহাকে কিছুই দিল না। তখন স্বর্গীয় দূত বলিলেন, আচ্ছা, যদি তুমি মিথ্যা কথা বলিয়া থাক, তবে যেমন ছিলে আল্লাহ তোমাকে আবার তেমনি করিবেন।
তারপর স্বর্গীয় দূত পূর্বে যে অন্ধ ছিল, তাহার কাছে গিয়া বলিলেন, আমি এক বিদেশি। বিদেশে আমার সম্বল ফুরাইয়া গিয়াছে। এখন আল্লাহর দয়া ছাড়া আমার দেশে পৌঁছিবার আর কোনো উপায় নাই। যিনি তোমার চক্ষু ভালো করিয়া দিয়াছেন, আমি তোমাকে সেই আল্লাহর দোহাই দিয়া একটি ছাগল চাহিতেছি; যেন আমি সেই ছাগল-বেচা টাকা দিয়া দেশে ফিরিয়া যাইতে পারি।
তখন সে বলিল, হ্যাঁ ঠিক তো। আমি অন্ধ ছিলাম, পরে আল্লাহ আমাকে দেখিবার ক্ষমতা দিয়াছেন। আমি গরিব ছিলাম, তিনি আমাকে আমির করিয়াছেন। তুমি যাহা চাও লও। আল্লাহর কসম, আল্লাহর উদ্দেশ্যে যে জিনিস লইতে তোমার মন চায়, তাহা যদি তুমি না লও, তবে আমি তোমাকে কিছুতেই ভালো লোক বলিব না।
ফেরেশতা তখন বলিলেন, বাস্। তোমার জিনিস তোমারই থাক। তোমাদের পরীক্ষা লওয়া হইল। আল্লাহ তোমার উপর খুশি হইয়াছেন, আর তাহাদের উপর বেজার হইয়াছেন।

Content added || updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে
সাভারে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে

শব্দার্থ ও টীকা

671

ধবল - সাদা। শ্বেত। এক প্রকার চর্মরোগ- এই রোগে শরীরে চামড়া ও চুল সাদা হয়ে যায়।
গাভিন - গর্ভধারণ করেছে এমন (গাভিন গরু)।
আমির - ধনী। ধনবান।
সর্বাঙ্গে - (সর্ব+অঙ্গ> সর্বাঙ্গ+ এ বিভক্তি) সারা শরীরে। সমস্ত দেহে।
কসম - শপথ। দিব্যি।
স্বর্গীয় দূত - আল্লাহর বার্তা বাহক। সংবাদবাহক।
নূর - জ্যোতি। আলো।
পুঁজি - সম্বল। মূলধন।
দোহাই - শপথ। কসম।
সম্বল - পাথেয়। পুঁজি।
বেজার - অখুশি। অসন্তুষ্ট।

Content added By

পাঠ-পরিচিতি

549

সাধুরীতিতে রচিত এই গল্পে হাদিসের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। এই গল্পের মূল বাণী হচ্ছে আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন এবং সৎলোককে যথাযথ পুরস্কার দেন।
আরব দেশের তিন জন লোককে পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহ একজন ফেরেশতা পাঠান। এদের একজন ধবলরোগী একজন টাকওয়ালা এবং আরেকজন অন্ধ।
ফেরেশতার অনুগ্রহে এই তিন জনেরই শারীরিক ত্রুটি দূর হলো। তিন জনই সুন্দর সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের চেহারা পেল। শুধু তাই নয়, ফেরেশতার কৃপায় প্রথম জন একটি উট থেকে বহু উটের, দ্বিতীয় জন একটি গাভি থেকে বহু গাভির এবং তৃতীয় জন একটি ছাগল থেকে বহু ছাগলের মালিক হয়ে গেল।
কিছুদিন পর এদের পরীক্ষা করার জন্য ফেরেশতা গরিব বিদেশির ছদ্মবেশে এদের কাছে হাজির হলেন। তিনি একেক জনের কাছে গিয়ে তাদের আগের দুরবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাকে কিছু সাহায্য করতে বললেন। প্রথম দুজন তাদের আগের অবস্থার কথা অস্বীকার করে ছদ্মবেশী ফেরেশতাকে খালি হাতে বিদায় দিল। অন্যদিকে তৃতীয় জন নির্দ্বিধায় ফেরেশতার ইচ্ছেমতো সবকিছু দিতে রাজি হল। আল্লাহ তার উপর খুশি হলেন এবং তার সম্পদ তারই রয়ে গেল। প্রথম দুজনের উপর আল্লাহ অসন্তুষ্ট হলেন এবং তাদের অবস্থা আগের মতো হয়ে গেল। অকৃতজ্ঞরা তাদের অকৃতজ্ঞতার উপযুক্ত ফল পেল।

Content added By

লেখক-পরিচিতি

663

মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্ম ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার পেয়ারা গ্রামে। তিনি বহুভাষাবিদ ও পণ্ডিত হিসেবে খ্যাত। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কলকাতা সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতে বিএ অনার্স ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্বে এমএ পাস করেন। তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব বিভাগের প্রথম ছাত্র। পরে তিনি প্যারিসের সোরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব লিটারেচার ডিগ্রি লাভ করেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস রচনায় তিনি অসাধারণ পাণ্ডিত্যের পরিচয় দিয়েছেন। বাংলা ব্যাকরণ রচনাতেও তাঁর অবদান স্মরণীয়।
কর্মজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। ছোটদের জন্য তাঁর লেখা রচনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- 'শেষ নবীর সন্ধানে' ও 'গল্প মঞ্জুরী'। তাঁর সম্পাদনায় শিশু-পত্রিকা 'আঙুর' প্রকাশিত হয়। 'বাংলা ভাষার আঞ্চলিক অভিধান' সম্পাদনা তাঁর অসামান্য কীর্তি।
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল প্রাঙ্গণে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

Content added By

কর্ম-অনুশীলন

462
Please, contribute by adding content to কর্ম-অনুশীলন.
Content

মিনু (দ্বিতীয় অধ্যায়) (বনফুল)

10.5k

মা-মরা মেয়ে মিনু। বাবা জন্মের আগেই মারা গেছে। সে মানুষ হচ্ছে এক দূরসম্পর্কের পিসিমার বাড়িতে। বয়স মাত্র দশ, কিন্তু এই বয়সেই সবরকম কাজ করতে পারে সে। সবরকম কাজই করতে হয়। লোকে অবশ্য বলে যোগেন বসাক মহৎ লোক বলেই অনাথা বোবা মেয়েটাকে আশ্রয় দিয়েছেন। মহৎ হয়ে সুবিধাই হয়েছে যোগেন বসাকের। পেটভাতায় এমন সর্বগুণান্বিতা চব্বিশ ঘণ্টার চাকরানী পাওয়া শক্ত হতো তাঁর পক্ষে। বোবা হওয়াতে আরো সুবিধা হয়েছে, নীরবে কাজ করে। মিনু শুধু বোবা নয়, ঈষৎ কালাও। অনেক চেঁচিয়ে বললে, তবে শুনতে পায়। সব কথা শোনার দরকারও হয় না তার। ঠোঁটনাড়া আর মুখের ভাব দেখেই সব বুঝতে পারে। এছাড়া তার আর একটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আছে যার সাহায্যে সে এমন সব জিনিস বুঝতে পারে, এমন সব জিনিস মনে মনে সৃষ্টি করে, সাধারণ বুদ্ধিতে যার মানে হয় না। মিনুর জগৎ চোখের জগৎ, দৃষ্টির ভিতর দিয়েই সৃষ্টিকে গ্রহণ করেছে সে। শুধু গ্রহণ করে নি, নতুন রূপে নতুন রং আরোপ করেছে তাতে।

খুব ভোরে ওঠে সে। ভোর চারটের সময়। উঠেই দেখতে পায় পূর্ব আকাশে দপদপ করে জ্বলছে শুকতারা। পরিচিত বন্ধুকে দেখলে মুখে যেমন মৃদু হাসি ফুটে ওঠে, তেমনি হাসি ফুটে ওঠে মিনুর মুখেও। মিনু মনে মনে বলে-সই ঠিক সময়ে উঠেছ দেখছি। বৈজ্ঞানিকের চোখে শুকতারা বিরাট বিশাল বাষ্পমণ্ডিত প্রকাণ্ড গ্রহ, কবির চোখে নিশাবসানের আলোকদূত, কিন্তু মিনুর চোখে সে সই। মিনুর বিশ্বাস সে-ও তার মতো কয়লা ভাঙতে উঠেছে ভোর বেলায়, আকাশবাসী তার কোনো পিসেমশায়ের গৃহস্থালিতে উনুন ধরাবার জন্যে। আকাশের পিসেমশায়ও হয়তো ডেলিপ্যাসেঞ্জারি করে তার নিজের পিসেমশায়ের মতো। শুকতারার আশেপাশে কালো মেঘের টুকরো যখন দেখতে পায়, তখন ভাবে ঐ যে কয়লা। কী বিচ্ছিরি করে ছড়িয়ে রেখেছে আজ। বলে আর মুচকি মুচকি হাসে। তারপর নিজে যায় সে কয়লা ভাঙতে। কয়লাগুলো ওর শত্রু। শত্রুর উপর হাতুড়ি চালিয়ে ভারি তৃপ্তি হয় ওর। হাতুড়িটার নাম রেখেছে গদাই, আর যে পাথরটার উপর রেখে কয়লা ভাঙে তার নাম দিয়েছে শানু। শানের সঙ্গে মিল আছে বলে বোধ হয়। কয়লা-গাদার কাছে গিয়ে রোজ সে ওদের মনে মনে ডাকে-ও গদাই ও শানু ওঠো এবার, রাত যে পুইয়ে গেছে। সই এসে কয়লা ভাঙছে। তোমরাও ওঠো, কয়লা ভেঙে তারপর যায় সে ঘুঁটের কাছে। ঘুঁটে তার কাছে ঘুঁটে নয়, তরকারি। উনুনের নাম রাক্ষসী। উনুন রাক্ষসী কেরোসিন তেল দেওয়া ঘুঁটের তরকারি দিয়ে শত্রুদের মানে কয়লাদের। খাবে। আঁচটা যখন গনগন করে ধরে ওঠে তখন
ভারি আনন্দ হয় মিনুর। জ্বলন্ত কয়লাগুলোকে তার মনে হয় রক্তাক্ত মাংস, আর আগুনের লাল আভাকে মনে হয় রাক্ষসীর তৃপ্তি। বিস্ফারিত নয়নে সে চেয়ে থাকে। তারপর ছুটে চলে যায় উঠোনে; আকাশের
দিকে চেয়ে দেখে সেখানে উষার লাল আভা ফুটছে কি না। উষার লাল আভা যেদিন ভালো করে ফোটে সেদিন সে ভাবে সইয়ের উনুনে চমৎকার আঁচ এসেছে। যেদিন আকাশ মেঘে ঢাকা থাকে সেদিন ভাবে, ছাই পরিষ্কার করে নি, তাই আঁচ ওঠে নি আজ। এইভাবে নিজের একটা অভিনব জগৎ সৃষ্টি করেছে সে মনে মনে। সে জগতের সঙ্গে বাইরের জগতের মিল নেই। সে জগতে তার শত্রু-মিত্র সব আছে। আগেই বলেছি কয়লা তার শত্রু। রান্নাঘরের বাসনগুলি সব তার বন্ধু। তাদের নাম রেখেছে সে আলাদা আলাদা। ঘটিটার নাম পুটি। ঘটিটা একদিন হাত থেকে পড়ে গিয়ে তুবড়ে গেল। মিনুর সে কী কান্না! তোবড়ানো জায়গাটায় রোজ হাত বুলিয়ে দেয়। গেলাস চারটের নাম হারু, বাবু, তারু আর কারু। চারটে গেলাসই একরকম। কিন্তু মিনুর চোখে তাদের পার্থক্য ধরা পড়ে। গেলাসগুলোকে যখন মাজে বা ধোয় তখন মনে হয় সে যেন ছোট ছেলেদের স্নান করাচ্ছে। মিটসেফটা ওর শত্রু। ওটার নাম দিয়েছে গপগপা। গপগপ করে সব জিনিস পেটে পুরে নেয়। মাঝে মাঝে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে মিটসেফের চকচকে তালাটার দিকে, আর মনে মনে বলে- আ মর, মুখপোড়া সব জিনিস পেটে পুরে বসে আছে। মিনুর আর একটি দৈনন্দিন কর্তব্য আছে। যখন অবসর পায় টুক করে চলে যায় ছাদে। ছাদ থেকে একটা বড় কাঁঠাল গাছ দেখা যায়। কাঁঠাল গাছের মাথার দিক থেকে একটা সরু শুকনো ডাল বেরিয়ে আছে। সেই ডালটার দিকে সাগ্রহে চেয়ে থাকে মিনু। মনে হয় তার সমস্ত অন্তর যেন তার দৃষ্টিপথে বেরিয়ে গিয়ে আশ্রয় করেছে ওই ডালটাকে। এর কারণ আছে। তার জন্মের পূর্বেই তার বাবার মৃত্যু হয়েছিল। বাবাকে সে দেখে নি। অনেকদিন আগে তার মাসিমা তার কানের কাছে চিৎকার করে একটা বিস্ময়কর খবর বলেছিল। তার বাবা নাকি বিদেশ গেছে, অনেক দূর বিদেশ, মিনু বড় হলে তার কাছে ফিরে আসবে, হয়তো তার কোলেই আসবে। মিনু বুঝতে পারে নি ব্যাপারটা ভালো করে। একটা জিনিস কেবল তার মনে গাঁথা হয়ে ছিল, বাবা ফিরে আসবে। কবে আসবে? মিনু কত বড় হলে আসবে? কথাটা মাঝে মাঝে ভাবত সে।

এমন সময় একদিন একটা ঘটনা ঘটল। সে সেদিনও ছাদে দাঁড়িয়েছিল। দেখতে পেল পাশের বাড়ির টুনুর বাবা এলো বিদেশ থেকে অনেক জিনিসপত্র নিয়ে, আর ঠিক সেই সময়ে তার নজরে পড়ল ঐ সরু ডালটায় একটা হলদে পাখিও এসে বসল। সেদিন থেকে তার বদ্ধ ধারণা হয়ে গেছে ওই সরু ডালে যেদিন হলদে পাখি এসে আবার বসবে, সেদিনই তার বাবা আসবে বিদেশ থেকে। তাই ফাঁক পেলেই সে ছাদে ওঠে। কাঁঠাল গাছের ওই সরু ডালটার দিকে চেয়ে থাকে। হলদে পাখি কিন্তু আর এসে বসে না। তবু রোজ একবার ছাদে ওঠে মিনু। এটা তার দৈনন্দিন কর্তব্যের মধ্যে একটা। এর কয়েকদিন পর রাত্রে কম্প দিয়ে জ্বর এলো তার। কাউকে কিছু বললে না। মনে হলো জ্বর হওয়াটাও বুঝি অপরাধ একটা। ভোরে ঘুম ভেঙে গেল, রোজ যেমন কয়লা ভাঙতে যায় সেদিনও তেমনি গেল, সেদিনও চোখে পড়ল শুকতারাটা দপদপ করে জ্বলছে। মনে মনে বলল- সই এসেছিস। আমার শরীরটা আজ ভালো নেই ভাই। তুই ভালো আছিস তো? উনুনে আঁচ দিয়ে কিন্তু সে আর জল ভরতে পারল না সেদিন। শরীরটা বড্ড বেশি খারাপ হতে লাগল। আস্তে আস্তে গিয়ে শুয়ে পড়ল নিজের বিছানায়। কেমন যেন ঘোর-ঘোর মনে হতে লাগল। নিজের ছোট্ট ঘরটিতে মিনু জ্বরের ঘোরে শুয়ে রইল খানিকক্ষণ। জ্বরের ঘোরেই হঠাৎ তার মনে হয় একটা দরকারি কাজ করা হয় নি। আস্তে আস্তে উঠল সে বিছানা থেকে, তারপর খিড়কির দরজা দিয়ে গিয়ে দাঁড়াল ছাদের সিঁড়ির কাছে। সিঁড়ির কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আস্তে আস্তে উঠে গেল ছাদে। কেউ দেখতে পেল না। পিসিমা পিসেমশাই তখনও ঘুমুচ্ছেন। ছাদে উঠেই চোখে পড়ল লালে লাল হয়ে গেছে পূর্বাকাশ। বাঃ চমৎকার আঁচ উঠেছে তো সইয়ের। একটু হাসল সে। তারপর চাইল সেই সরু ডালটার দিকে। সর্বাঙ্গ রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল তার। একটা হলদে পাখি এসে বসেছে। তাহলে তো বাবা নিশ্চয় এসেছে। আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না ছাদে। যদিও পা টলছিল তবু সে প্রায় ছুটে বেরিয়ে এলো বাইরে।

Content added || updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও

টুনি বাকপ্রতিবন্ধী মেয়ে। কিন্তু সে তাতে মন মন খারাপ না করে তার পোষা গরু, ছাগল ও বিড়ালের সাথে ভাব বিনিময় করে।

ঘরের ছাদে গিয়ে
কয়লা-গাদার কাছে ছে গিয়ে
ঘরে গিয়ে
উনুনের কাছে গিয়ে

শব্দার্থ ও টীকা

534

পেটভাতায় - পেটেভাতে। প্রয়োজনীয় খাদ্যের বিনিময়ে।
কালা - বধির। কানে কম শোনে এমন।
ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় - চোখ, কান, নাক, জিভ, ত্বক-এই পাঁচ ইন্দ্রিয়ের বাইরে বিশেষ কিছু। অতীন্দ্রিয় উপলব্ধি।
শুকতারা - সূর্যোদয়ের আগে পুব আকাশে এবং সূর্যাস্তের পর পশ্চিম আকাশে নক্ষত্রের মতো দীপ্তিমান শুক্রগ্রহ।
গ্রহ - সূর্য প্রদক্ষিণকারী জ্যোতিষ্ক।
সই - সখির কথ্য রূপ। বান্ধবী। সহচরী।
আকাশবাসী - কল্পিত ঊর্ধ্বলোকে বসবাসকারী।
ডেলিপ্যাসেঞ্জারি - প্রত্যহ যাতায়াতকারী।
উনুন - চুলা।
মিটসেফ - রান্নাঘরে খাদ্য রাখার তাকবিশিষ্ট বাক্স।
খিড়কি - বাড়ির পেছনের ছোট দরজা।
রোমাঞ্চিত - পুলকিত। আনন্দিত।

Content added By

পাঠের উদ্দেশ্য

389

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের প্রতি মমত্ববোধ জাগ্রত করা।

Content added By

পাঠ-পরিচিতি

334

বিচিত্র মানুষের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে আমাদের এ সমাজ। কেউ সুস্থ, কেউবা পুরো সুস্থ নয়। বাষ্প্রতিবন্ধী মানুষও আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়। ছোট্ট মেয়ে মিনু বাক্ ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী। তার মা-বাবা নেই। তাই বলে জীবনকে সে তুচ্ছ মনে করে না। দূর-সম্পর্কীয় এক আত্মীয়ের বাসায় তাকে থাকতে হয়। সেখানে গৃহকর্মে তার অখণ্ড মনোযোগ। শুধু তাই নয়, প্রকৃতির সঙ্গেও সে মিতালি পাতিয়েছে। ভোরবেলাকার নতুন সূর্যকে নিজের জ্বালানো চুল্লির সঙ্গে তুলনা করতেই তার ভালো লাগে। হলদে পাখি দেখে তার মনে পুলক জাগে। পাশের বাসায় কোনো এক প্রবাসী পিতার আগমন লক্ষ করে সে মনে করে, একদিন তার বাবাও ফিরে আসবে। পিতার জন্য মনে মনে অপেক্ষা করে কিশোরী। হলদে পাখি আসে কিন্তু তার পিতা আসে না-এই কষ্ট তার একান্ত নিজস্ব। তবুও সে স্বপ্ন দেখে। এই স্বপ্নই তাকে সমস্ত প্রতিকূলতা অতিক্রম করতে সাহায্য করে।

Content added By

লেখক-পরিচিতি

475

বনফুলের প্রকৃত নাম বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়। তিনি ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের বিহারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে চাকরি করলেও সাহিত্যের প্রতি, তাঁর আগ্রহ ছিল ব্যাপক। তিনি তাঁর গল্পকে আকারে ছোট, ব্যঙ্গ-রসিকতায় পূর্ণ ও আকর্ষণীয় করে উপস্থাপনার মাধ্যমে সাহিত্যাঙ্গনে বিশেষ স্থান করে নিয়েছেন। বাস্তবজীবন, মানুষের সংবেদনশীলতা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিচিত্র উপাদানকে তিনি গল্পের বিষয় করেছেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ হলো: 'বনফুলের গল্প', 'বাহুল্য', 'অদৃশ্যলোকে', 'বহুবর্ণ', 'অনুগামিনী' ইত্যাদি। তিনি বেশ কিছু উপন্যাস, নাটক আর কাব্যও লিখেছেন। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে 'পদ্মভূষণ' (ভারত) উপাধি প্রদান করা হয়। ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে বনফুল কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।

Content added By

কর্ম-অনুশীলন

1k

১. বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন একজন শিশুকে নিয়ে গল্প, কবিতা বা সংক্ষিপ্ত রচনা লেখ। মনে রাখবে তুমি যা-ই লেখ না কেন শিশুটির প্রতি যেন মমত্ববোধ প্রকাশ পায়।
২. বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের প্রতি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রচারণার জন্য পোস্টার ও লিফলেট তৈরি কর।

Content added By

নীল নদ আর পিরামিডের দেশ (তৃতীয় অধ্যায়) (সৈয়দ মুজতবা আলী)

6.7k

সন্ধ্যের দিকে জাহাজ সুয়েজ বন্দরে পৌঁছল।
সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ঘন নীলাকাশ কেমন যেন সূর্যের লাল আর নীল মিলে বেগুনি রং ধারণ করছে। ভূমধ্যসাগর থেকে একশ মাইল পেরিয়ে আসছে মন্দমধুর ঠান্ডা হাওয়া।
সূর্য অস্ত গেল মিশর মরুভূমির পিছনে। সোনালি বালিতে সূর্যরশ্মি প্রতিফলিত হয়ে সেটা আকাশের বুকে হানা দেয় এবং ক্ষণে ক্ষণে সেখানকার রং বদলাতে থাকে। তার একটা রং ঠিক চেনা কোন জিনিসের রং সেটা বুঝতে-না-বুঝতে সে রং বদলে গিয়ে অন্য জিনিসের রং ধরে ফেলে।
আমরা বন্দর ছেড়ে মরুভূমিতে ঢুকে গিয়েছি। পিছনে তাকিয়ে দেখি, শহরের বিজলি বাতি ক্রমেই নিষ্প্রভ হয়ে আসছে।
মরুভূমির উপর চন্দ্রালোক। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। সে দৃশ্য বাংলাদেশের সবুজ শ্যামলিমার মাঝখানে দেখা যায় না। সমস্ত ব্যাপারটা কেমন যেন ভূতুড়ে বলে মনে হয়। চলে যাচ্ছে দূর দিগন্তে, অথচ হঠাৎ যেন ঝাপসা আবছায়া পর্দায় ধাক্কা খেয়ে থেমে যায়।
মাঝে মাঝে আবার হঠাৎ মোটরের দুমাথা উঁচুতে ওঠে। জ্বলজ্বল দুটি ছোট সবুজ আলো। ওগুলো কী? ভূতের চোখ নাকি? শুনেছি ভূতের চোখই সবুজ রঙের হয়। না! কাছে আসতে দেখি উটের ক্যারাভান-এদেশের ভাষাতে যাকে বলে 'কাফেলা'।
উটের চোখের উপর মোটরের হেডলাইট পড়াতে চোখদুটো সবুজ হয়ে আমাদের চোখে ধরা দিয়েছে। ভয় পেয়ে গিয়েছিলুম। আর কেনই পাব না বলো? মরুভূমি সম্বন্ধে কতো গল্প, কতো সত্য, কতো মিথ্যে পড়েছি ছেলেবেলায়। তৃষ্ণায় সেখানে বেদুইন মারা যায়, মৃত্যু থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য বেদুইন তার পুত্রের চেয়ে প্রিয়তর উটের গলা কাটে, উটের জমানো জল খায় প্রাণ বাঁচাবার জন্য।
যদি মোটর ভেঙে যায়? যদি কাল সন্ধ্যে অবধি এ রাস্তা দিয়ে আর কোনো মোটর না আসে? স্পষ্ট দেখতে পেলুম এ গাড়ি রওনা হওয়ার পূর্বে পাঁচশ গ্যালন জল সঙ্গে তুলে নেয় নি, তখন কী হবে উপায়? মরুভূমির ভিতর দিয়ে যাচ্ছি। জাহাজে চড়ার সময় কি কল্পনা করতে পেরেছিলুম, জাহাজে চড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফোকটে মরুভূমির ভিতর দিয়ে চলে যাব?
কতোক্ষণ ঘুমিয়েছিলুম মনে নেই। যখন মোটরের হঠাৎ একটুখানি জোর ঝাঁকুনিতে ঘুম ভাঙল তখন দেখি চোখের সামনে সারি সারি আলো। কায়রো পৌঁছে গিয়েছি।
শহরতলিতে ঢুকলাম। খোলা জানালা দিয়ে সারি সারি আলো দেখা যাচ্ছে। এই শহরতলিতেই কতো না রেস্তোঁরা, কতো না ক্যাফে খোলা, খদ্দেরে খদ্দেরে গিসগিস করছে। রাত তখন এগারটা। আমি বিস্তর বড় বড় শহর দেখেছি। কায়রোর মতো নিশাচর শহর কোথাও চোখে পড়ে নি। কায়রোর রান্নার খুশবাইয়ে রাস্তা ম-ম করছে। মাঝে মাঝে নাকে এসে এমন ধাক্কা লাগায় যে মনে হয় নেমে পড়ে এখানেই চাট্টি খেয়ে যাই। অবশ্য রেস্তোঁরাগুলো আমাদের পাড়ার দোকানের মতো নোরা।
সবাই নিকটতম রেস্তোঁরায় হুড়মুড় করে ঢুকলুম। কারণ সবাই তখন ক্ষুধায় কাতর। তড়িঘড়ি তিনখানি ছোট ছোট টেবিল একজোড় করে চেয়ার সাজিয়ে আমাদের বসবার ব্যবস্থা করা হলো, রান্নাঘর থেকে স্বয়ং বাবুর্চি ছুটে এসে তোয়ালে কাঁধে বারবার ঝুঁকে ঝুঁকে সেলাম জানালো।

মিশরীয় রান্না ভারতীয় রান্নার মামাতো বোন অবশ্য ভারতীয় মোগলাই রান্নার। বারকোশে হরেক রকম খাবারের নমুনা। তাতে দেখলুম, রয়েছে মুরগি মুসল্লম, শিক কাবাব, শামি কাবাব আর গোটা পাঁচ-ছয় অজানা জিনিস। আমার প্রাণ অবশ্য তখন কাঁদছিল চারটি আতপ চাল, উচ্ছেভাজা, সোনামুগের ডাল, পটলভাজা আর মাছের ঝোলের জন্য। অত-শত বলি কেন? শুধু ঝোল-ভাতের জন্য। কিন্তু ওসব জিনিস তো আর বাংলাদেশের বাইরে পাওয়া যায় না, কাজেই শোক করে কী লাভ?
আহারাদি সমাপ্ত করে আমরা ফের গাড়িতে উঠলুম। ততক্ষণে আমরা কায়রো শহরের ঠিক মাঝখানে ঢুকে গিয়েছি। গন্ডায় গন্ডায় রেস্তোঁরা, হোটেল, সিনেমা, ডানস্ হল, ক্যাবারে। খদ্দেরে তামাম শহরটা আবজাব করছে। কতো জাত-বেজাতের লোক।
ঐ দেখ, অতি খানদানি নিগ্রো। ভেড়ার লোমের মতো কোঁকড়া কালো চুল, লাল লাল পুরু দুখানা ঠোঁট, বোঁচা নাক, ঝিনুকের মতো দাঁত আর কালো চামড়ার কী অসীম সৌন্দর্য। আমি জানি এরা তেল মাখে না। কিন্তু আহা, ওদের সর্বাঙ্গ দিয়ে যেন তেল ঝরছে।

ঐ দেখ, সুদানবাসী। সবাই প্রায় ছফুট লম্বা। আর লম্বা আলখাল্লা পরেছে বলে মনে হয়। দৈর্ঘ্য ছফুটের চেয়েও বেশি। এদের রং ব্রোঞ্জের মতো। এদের ঠোঁট নিগ্রোদের মতো পুরু নয়, টকটকে লালও নয়।
কায়রোতে বৃষ্টি হয় দৈবাৎ। তাও দু এক ইঞ্চির বেশি নয়। তাই লোকজন সব বসেছে হোটেল কাফের বারান্দায় কিংবা চাতালে। শুনলাম, এখানকার বায়স্কোপও বেশির ভাগ হয় খোলামেলাতে।
মোটর গাড়ি বড্ড তাড়াতাড়ি চলে বলে ভালো করে সব কিছু দেখতে পেলুম না। কিন্তু এইবার চোখের সামনে ভেসে উঠল অতি রমণীয় এক দৃশ্য। নাইল-নীল নদ।
চাঁদের আলোতে দেখছি, নীলের উপর দিয়ে চলেছে মাঝারি ধরনের খোলা মহাজনি নৌকা-হাওয়াতে কাত হয়ে তেকোণা পাল পেটুক ছেলের মতো পেট ফুলিয়ে দিয়ে। ভয় হয়, আর সামান্য একটুখানি জোর হাওয়া বইলেই, হয় পালটা এক ঝটকায় চৌচির হয়ে যাবে, নয় নৌকাটা পিছনে ধাক্কা খেয়ে গোটা আড়াই ডিগবাজি খেয়ে নীলের অতলে তলিয়ে যাবে।
এই নীলের জল দিয়ে এদেশের চাষ হয়। এই নীল তার বুকে ধরে সে চাষের ফসল মিশরের সর্বত্র পৌঁছে দেয়।
পিরামিড! পিরামিড!! পিরামিড!!!
চোখের সামনে দাঁড়িয়ে তিনটে পিরামিড? এই তিনটে পিরামিড পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো কীর্তিস্তম্ভ। যুগ যুগ ধরে মানুষ এদের সামনে দাঁড়িয়ে বিস্তর জল্পনা-কল্পনা করেছে, দেয়ালে খোদাই এদের লিপি উদ্ধার করে এদের সম্বন্ধে পাকা খবর সংগ্রহ করার চেষ্টা করেছে।
মিশরের ভিতরে-বাইরে আরও পিরামিড আছে। কিন্তু গিজে অঞ্চলের যে তিনটি পিরামিডের সামনে আমরা দাঁড়িয়ে, সেগুলোই ভুবনবিখ্যাত, পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম।
প্রায় পাঁচশ ফুট উঁচু বলে, না দেখে চট করে পিরামিডের উচ্চতা সম্বন্ধে ধারণা করা যায় না। এমন কি চোখের সামনে দেখেও ধারণা করা যায় না, এরা ঠিক কতোখানি উঁচু। চ্যাপ্টা আকারের একটা বিরাট জিনিস আস্তে আস্তে ক্ষীণ হয়ে পাঁচশ ফুট উঁচু না হয়ে যদি চোঙ্গার মতো একই সাইজ রেখে উঁচু হতো, তবে স্পষ্ট বোঝা যেত পাঁচশ ফুটের উচ্চতা কতোখানি উঁচু।

তাই বোঝা যায়, এ বস্তু তৈরি করতে কেন তেইশ লক্ষ টুকরো পাথরের প্রয়োজন হয়েছিল। 'টুকরো' বলতে একটু কমিয়ে বলা হলো, কারণ এর চার-পাঁচ টুকরো একত্রে করলে একখানা ছোট-খাট ইঞ্জিনের সাইজ এবং ওজন হয়। কিংবা বলতে পার, ছ ফুট উঁচু এবং তিন ফুট চওড়া করে এ পাথর দিয়ে একটা দেয়াল বানালে সে দেয়াল লম্বায় ছশ পঞ্চাশ মাইল হবে।
সবচেয়ে বড় পিরামিডটা বানাতে নাকি এক লক্ষ লোকের বিশ বৎসর লেগেছিল। ফারাওরা (সম্রাটরা) বিশ্বাস করতেন, তাদের শরীর যদি মৃত্যুর পর পচে যায় কিংবা কোনো প্রকারের আঘাতে ক্ষত হয়, তবে তাঁরা পরলোকে অনন্ত জীবন পাবেন না। তাই মৃত্যুর পর দেহকে 'মমি' বানিয়ে সেটাকে এমন একটা শক্ত পিরামিডের ভিতর রাখা হতো যে, তার ভিতর ঢুকে কেউ যেন মমিকে ছুঁতে পর্যন্ত না পারে।

নিদ্রিতের চোখে যে রকম পড়ে, আমার চোখে ঠিক তেমনি এসে পড়লো পশ্চিমাকাশ থেকে চন্দ্রাস্তের রক্তচ্ছটা আর পূর্বাকাশ থেকে নব অরুণোদয়ের পূর্বাভাস।
রাস্তা ক্রমেই সরু হয়ে আসছে। রাস্তায় দুদিকে দোকানপাট এখনও বন্ধ। দু একটা কফির দোকান খুলি খুলি করছে। ফুটপাতে লোহার চেয়ারের উপর পদ্মাসনে বসে দু-চারটি সুদানি দারোয়ান তসবি জপছে, খবরের কাগজগুলোর দোকানের সামনে অল্প একটু ভিড়।
তরল অন্ধকার সরল আলোর জন্য ক্রমেই জায়গা করে দিচ্ছে। আধো ঘুমে আধো জাগরণে জড়ানো হয়ে সব কিছুই যেন কিছু কিছু দেখা হলো। সবচেয়ে সুন্দর দেখাচ্ছিল মসজিদের মিনারগুলোকে। এদের বহু মিনার দাঁড়িয়ে আছে আল্লাহর নামাজের ঘর মসজিদের উপর। মসজিদে যে নিপুণ মোলায়েম কারুকার্য আছে সে রকম করবার মতো হাত আজকের দিনে কারও নেই।
প্রকৃতির গড়া নীল, আর মানুষের গড়া পিরামিডের পরেই মিশরের মসজিদ ভুবন বিখ্যাত এবং সৌন্দর্যে অতুলনীয়। পৃথিবীর বহু সমঝদার শুধু এই মসজিদগুলোকেই প্রাণভরে দেখবার জন্য সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে কায়রোতে আসেন।

Content added || updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

এটি পুষ্টিকর খাবার
এটি বাঙালির খাবার
এটি মুখরোচক খাবার
এটি থাই খাবার

শব্দার্থ ও টীকা

677

নিষ্প্রভ - দীপ্তিহীন। নিস্তেজ।
ভূতুড়ে - ভূত-প্রেত সম্পর্কিত। রহস্যময়।
ক্যারাভান - কাফেলা।
বেদুইন - আরবের একটি যাযাবর জাতি।
নিষ্কৃতি - নিস্তার। রেহাই। অব্যাহতি।
ফোকটে - ফাঁকতালে।
রেস্তোরাঁ - হোটেল বিশেষ।
হুড়মুড় - ঠেলাঠেলি করে ঢোকা বা বের হওয়ার ভাব নির্দেশক
বারকোশ - কাষ্ঠনির্মিত কানা উঁচু বড় থালা।
গন্ডা - চারটি।
ক্যাবারে - নাচঘরে
তামাম - সমস্ত। পুরো।
আবজাব - গিজগিজ। ঠাসাঠাসি।
জাত-বেজাত - নানা জাতি।
খানদানি - বংশমর্যাদাযুক্ত। অভিজাত। উচ্চবংশীয়।
আল্লখাল্লা - লম্বা ঢিলা জামা বিশেষ।
দৈবাৎ - সহসা, হঠাৎ।
অতি রমণীয় - খুব সুন্দর।
কীর্তিস্তম্ভ - মহৎ অবদান স্মরণে নির্মিত সৌধ।
মমি - কৃত্রিমভাবে সংরক্ষিত মৃতদেহ।
চন্দ্রান্ত - চাঁদের অস্ত যাওয়া।
অরুণোদয় - সূর্যের উদয়।
পূর্বাভাস - ভাবী ঘটনার সংকেত। যা ঘটবে তার সংকেত।

Content added By

পাঠের উদ্দেশ্য

412

শিক্ষার্থীদের ভ্রমণে আগ্রহী করে তোলা এবং অন্য দেশের ইতিহাস-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানানো।

Content added By

পাঠ-পরিচিতি

774

বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতাগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে মিশর। প্রাচীন কাল থেকে মিশরের নীল নদকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল ঐ সভ্যতা। মিশরের আবহাওয়া শুষ্ক বলে ঐ সভ্যতার অনেক নিদর্শন কালের কবলে হারিয়ে যায়নি। উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার এই দেশটির বিশেষ করে কায়রো শহরের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে পঠিত রচনায়। রচনাটি সৈয়দ মুজতবা আলীর 'জলে ডাঙ্গায়' গ্রন্থ থেকে সংক্ষিপ্ত ও পরিমার্জন করে সংকলন করা হয়েছে।
এই রচনায় এসেছে চারদিকে মরুভূমি-ঘেরা ঐতিহাসিক কায়রো শহর, কায়রোর অদূরে গিজে অঞ্চলে অবস্থিত পিরামিড ও মিশরের ভুবন বিখ্যাত মসজিদের প্রসঙ্গ। এসবের আকর্ষণে সারা বিশ্বের পর্যটকরা ছুটে যায় কায়রো অভিমুখে। কায়রো শহর আলোয় ভরে যায় রাতের বেলায়। রেস্তোঁরাগুলো থেকে ভেসে আসা নানা রকম খাবার-দাবারের সুগন্ধ বাড়িয়ে দেয় পথচারীদের ক্ষুধা। অদূরেই গিজে শহরে রয়েছে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার আকর্ষণ ও পৃথিবীর সপ্ত আশ্চর্যের একটি মিশরের পিরামিড। পিরামিড নির্মিত হয়েছিল মিশরের প্রাচীন সম্রাট ফারাওদের মৃতদেহ মমি হিসেবে কবরস্থ করে রাখার জন্য। পাথরের চাঁই দিয়ে তৈরি বিশালাকার সমাধিস্তম্ভ এটি। নীলনদ আর পিরামিডের পরেই মিশরের অতুলনীয় আকর্ষণ হচ্ছে সেখানকার ভুবন বিখ্যাত অপূর্ব সৌন্দর্যের মসজিদগুলো। এসবের টানেই সমঝদার আর ভ্রমণপিপাসু মানুষ ছুটে যায় মিশরে।

Content added By

লেখক-পরিচিতি

513

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রম্যরচনা ও অনন্য গদ্যশৈলীর স্রষ্টা সৈয়দ মুজতবা আলী। তাঁর জন্ম আসামের করিমগঞ্জে ১৯০৪ সালে। রবীন্দ্রনাথের স্নেহসান্নিধ্যে পাঁচ বছর লেখাপড়ার পর তিনি শান্তিনিকেতন থেকে স্নাতক হন। এছাড়া তিনি আলীগড় কলেজ, বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় ও কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যয়ন করেছেন।
মূলত রম্যরচয়িতা হিসেবে বাংলা সাহিত্যে খ্যাত এই লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে 'শবনম', 'দেশে বিদেশে', 'পঞ্চতন্ত্র', 'চাচা কাহিনী', 'জলে ডাঙ্গায়'।
তিনি ১৯৭৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

Content added By

কর্ম-অনুশীলন

594

ক. নীল নদ আর পিরামিডের দেশ ভ্রমণের একটি দৃশ্যচিত্র অঙ্কন কর।
খ. তিনশো শব্দের মধ্যে তোমার ব্যক্তিগত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লেখ।

Content added By

তোলপাড় (চতুর্থ অধ্যায়) (শওকত ওসমান)

3.9k

একদিন বিকেলে হন্তদন্ত সাবু বাড়ির উঠান থেকে 'মা মা' চিৎকার দিতে দিতে ঘরে ঢুকল। জৈতুন বিবি হকচকিয়ে যায়। রান্নাঘরে পাক করছিল সে। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে শুধায়, কী রে-এত চিক্কর পাড়স ক্যান?

  • মা, ঢাকা শহরে গুলি কইরা মানুষ মারছে-
  • কে মারছে?
  • পাঞ্জাবি মিলিটারি।

দেখা যায় সাবু খুব উত্তেজিত। মুখ দিয়ে কথা তাড়াতাড়ি বের করে দিতে চাইলেও পারে না। কারণ, শরীর থরথর কাঁপছে। হাতের মুঠি বারবার শক্ত হয়।

  • মা, একজন দুজন না। হাজার হাজার মানুষ মারছে।
  • কস কী, হাজার হাজার?
  • হ, সব মানুষ শহর ছাইড়া চইলা আইতেছে।

ঢাকা শহর থেকে পঞ্চাশ মাইল দূরবর্তী গাবতলি গ্রাম। কিন্তু যাতায়াতের সুবিধা নেই। তাই সব খবরই দু- দিন বাদে এসে পৌঁছায়। এবার কিন্তু তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। পরদিনই পাওয়া গেছে সব খবর। যারা জওয়ান তারা সোজা হেঁটে হেঁটে বাড়ি পৌঁছেছে। তাই খবর ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয় নি। পঁচিশে মার্চের রাত্রে পাঞ্জাবি মিলিটারি ঝাঁপিয়ে পড়ে। জীবন্ত যাকে পাচ্ছে তাকেই হত্যা করছে।

পরদিন সাবুর সামনে গোটা শহর যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ল। তাদের বাড়ির পাশ দিয়ে গেছে জেলা বোর্ডের সড়ক। সেই পথে মানুষ আসতে লাগল। একজন দুজন নয়, হাজার হাজার। একদম পিলপিল পিঁপড়ের সারি। গাবতলি গ্রাম তাদের গন্তব্য নয়। আরও দূরে যাবে তারা। কেউ কুমিল্লা, কেউ নোয়াখালি, কেউ ময়মনসিংহ-একদম গারো পাহাড়ের কাছাকাছি, আরও নানা এলাকায়।
দারুণ রোদ্দুর মাথার উপরে। আর ভিড়। নিশ্বাসে নিশ্বাসে তাপ বাড়ে। হাঁটার জন্য ক্লান্তি বাড়ে। সব মিলিয়ে জওয়ান মানুষেরাই খাবি খাচ্ছে। মেয়ে, শিশু এবং বেশি বয়সীদের তো কথাই নেই। ক্ষুধার কথা চুলোয় যাক, পিয়াসে ছাতি ফেটে দুতিন জন রাস্তার ধারেই শেষ হয়ে গেল।

জৈতুন বিবি মুড়ি ভেজে দিয়েছিল খুব ভোর-ভোর উঠে। সাবু চাঙারি বোঝাই করে মুড়ি এনে ওদের খাইয়েছে। নিজেরা কীভাবে চলবে সে কথা ভাবে নি। মুড়ি শেষ হলে সে পানি জোগানোর কাজে এগিয়ে গেছে।
এক প্রৌঢ় নারীকে দেখে সে অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। পঞ্চাশের বেশি বয়স! কিন্তু কী ফরসা চেহারা! যেন কোনো ধলা পরি। মুখ দেখে বোঝা যায় অনেক হেঁটেছেন, অথচ তার জীবনে হাঁটার অভ্যেস নেই। সাবুর কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।

  • মা, পানি খাবেন?
  • দাও, বাবা। প্রৌঢ় নারী মুখ খুললেন। গ্লাস আবার ধুয়ে জালা থেকে পানি এগিয়ে দিয়েছিল সাবু। খালি গা। পরনে হাফপ্যান্ট, তাও ময়লা। বড় লজ্জা লাগে সাবুর। প্রৌঢ়া পানি খেয়ে তৃপ্ত। হাতে চামড়ার উপর নকশা-আঁকা ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছলেন। তারপর একটা পাঁচ টাকার নোট সাবুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, বাবা, তুমি কিছু কিনে খেও।
  • এ কী! না-না-
  • নাও, বাবা।
  • মাফ করবেন। টাকা নিলে আমারে মা বাড়ি থাইকা বাইর কইরা দিব। আমারে কইয়া দিছে, শহরের কত গণ্যমান্য মানুষ যাইব রাস্তা দিয়া! পয়সা দিলে নিবি না। খবরদার। সেই প্রৌঢ় নারী একটু হাঁফ ছেড়ে বললেন, তোমার মা কিছু বলবেন না।
  • আমার মা-রে আপনি চেনেন না। মা কন, বিপ পইড়া মানুষ বাড়ি আইলে কিছু লওয়া উচিত না। গরিব হইতাম পারি, কিন্তু আমরা জানোয়ার না। শেষ কথাগুলোর পর নিরুপায় সেই নারী সাবুর মুখের দিকে চেয়ে বললেন, বাবা, যদি কখনো ঢাকা শহরে যাও, আমাদের বাড়িতে এসো।
  • আপনাদের বাড়ি?
  • লালমাটিয়া ব্লক ডি। আমি মিসেস রহমান।

মিসেস রহমান আবার রাস্তা ধরলেন। সাবু বুঝতে পারে, এই গরমে হাঁটার পক্ষে মোটা শরীর আদৌ আরামের নয়। বেচারা নিরুপায়। শরীর তো আর নিজে তৈরি করেন নি। তিনি নিমেষে ভিড়ে মিশে গেলেন। ভিড় নয় স্রোত। শহর থেকে যে শুধু গণ্যমান্য মানুষ আসছে, তা নয়। সাধারণ মজুর-মিস্ত্রিরা পর্যন্ত আসছে। সাবু ভাবে, তা হলে শহরেও গরিব আছে, যারা তাদের মতোই কোনো রকমে দিন কাটায়, তাদেরই মতো যাদের ঠিকমতো বিশ্রাম জোটে না, আহার জোটে না, কাপড় জোটে না। এই সময় সাবুর আরো মনে হয়, একবার শহর দেখে এলে হতো। লোক তো শহর পর্যন্ত আছেই। এই জনস্রোত ধরে উজানে ঠেলে গেলেই সেখানে পৌঁছানো যাবে। কিন্তু তার সাহস হয় না।
একদিন তাদের গ্রামের পাশ দিয়ে গেল আট-নয় জনের একটি পরিবার। সম্ভ্রান্ত জন তারা। সত্তর বছরের বুড়ো তাদের সঙ্গে। তিনটি মাঝ-বয়সী মেয়ে-ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে বয়স- তাকে ধরে ধরে আনছে। সঙ্গে আরো পাঁচ-ছয়টি কুঁচো ছেলেমেয়ে, কেউ আট বছরের বেশি নয়। আর আছে লুঙ্গি পরা হাফ শার্ট পরিহিত জওয়ান একজন। তার চেহারা জানান দেয় বাড়ির চাকর। বুড়ো ঠিকমতো হাঁটতে পারে না। কখনো মেয়ে তিনটির সাহায্য নেয়, কখনো জওয়ান চাকরের! পাঁচ-ছটি কুঁচো ছেলেমেয়ের খবরদারিও সহজ নয়। কাজেই এই কাফেলা রীতিমতো নাজেহাল। আকাশে তেমনি কাঠফাটা রোদ।
শোনা গেল, বুড়োর তিন ছেলেকেই তার সামনে পাঞ্জাবি মিলিটারিরা গুলি করে মেরেছে। সঙ্গী মেয়ে তিনটি বিধবা বউ। কুঁচো ছেলেমেয়েগুলো বুড়োর নাতি-নাতনি।
গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতে তারা বসেছিল। খবর জানার কৌতূহলে গাবতলি গাঁয়ের অনেকে ছুটে আসে। আজ কিন্তু কাছে এসে সবাই মিলে যায়। সদ্য বিধবা তিনজন। আর সঙ্গে অমন জয়িফ মানুষ। কেউ মিলিটারির জুলুমের খবর জানবার জন্য আগ্রহ দেখায় না। বরং কীভাবে এদের সাহায্য করতে পারে, তাই জিজ্ঞাসা করে।

বুড়ো ভদ্রলোক রাজি ছিল না। তবু কয়েকজন উপযাচক হয়ে বিভিন্ন ভার নিল। সাবুও বাদ গেল না। সে একটা কচি ছেলেকে কোলে তুলে নিল। দুই মাইল দূরে নদীর ঘাট। সবাই মিলে পালা করে কাঁধে নিয়ে বুড়ো মানুষটিকে নদীর ঘাট পর্যন্ত দিয়ে আসবে। তারপর নৌকায় তুলে দেবে।
সাবুর কোলে গোলগাল বাচ্চাটা। বছর তিন বয়স। বেশ ভারি। কিন্তু ক্লান্তি নেই সাবুর। মাঝে মাঝে অন্য কেউ তার বোঝা হালকা করতে চাইলে সে বলে, আর একটু আগাইয়া দেই।
বৃদ্ধ আশেপাশের বাহকদের বলে, তোমরাই আমার ছেলে, বাবা। এই গরমে তোমরা ছাড়া কে আর এমন সাহায্য করত। ছেলে আর কোথায় পাব-
কথা শেষ হয় না, ফোঁপানির শব্দ ওঠে।
আবার বুড়োর ভাঙা ভাঙা গলা শোনা যায়, জীবনে নামাজ কাজা করি নি, বাবা। ইসলামের নাম নিয়ে বলল, পাকিস্তান হলে মুসলমানদের মঙ্গল হবে। হা- এই বয়সে সব ছেলেদের হারিয়ে-বুড়ো কথা শেষ করতে পারে না। দীর্ঘশ্বাস শোনা যায় শুধু।

সমস্ত কাফেলা নীরব। নারীদের মধ্যে একজন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করেছিল। তখনই থেমে গেল। কে আর কথা বলবে এমন জায়গায়। মনে হচ্ছিল, কতগুলো লাশ নিয়ে যেন সবাই হাঁটছে।
সাবু কল্পনার চোখে যেন সামনে দেখতে পায়:
খাকি উর্দি পরা কতগুলো সিপাই তার সামনে। আর সে তাদের লাথি মেরে মেরে ফুটবলের মতো গড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অসীম আক্রোশে তার রক্ত টগবগ করে ফুটতে থাকে। সেই সব দুশমন কখনও দেখে নি সে। সেই সব জানোয়ার কখনও দেখে নি সে, যারা তার দেশের মানুষকে বন্যার দিনের পিঁপড়ের মতো ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে জুলুমের দাপটে।
অমন জন্তুদের মোকাবিলার জন্য তার কিশোর বুকে আশ্চর্য তোলপাড় শুরু হয়ে যায়।

Content added || updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

সোনাকান্দা
গাবতলি
পাহাড়তলী
সোনাপুর

শব্দার্থ ও টীকা

389

চিক্কর - চিৎকার। উচ্চ স্বরে কান্না।
পাঞ্জাবি মিলিটারি - পাকিস্তানের পাঞ্জাব রেজিমেন্টের সৈনিক। পাকিস্তানি অন্যান্য সৈন্যদের সঙ্গে এরাও পূর্ব বাংলার নিরস্ত্র জনগণের ওপর নির্মম হত্যাকান্ড চালিয়েছিল।
পঁচিশে মার্চ - ১৯৭১ সালের পঁচিশে মার্চ। এই তারিখের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালিদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ শুরু করে।
গারো পাহাড় - বাংলাদেশের ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত পার্বত্য এলাকা।
প্রৌঢ় - প্রবীণ। যৌবন ও বার্ধক্যের মাঝামাঝি বয়সের।
খাবি খাওয়া - বিপদে পড়ে নিতান্ত নিরুপায় বোধ করা। মরণাপন্ন হওয়া। অসহায় বোধ করা।
চাঙারি - বাঁশের তৈরি ডালা, ঝুড়ি বা টুকরি।
নিমেষে - চোখের পলকে।
কাফেলা - সারি বেঁধে চলা পথিকের দল।
জালা - মাটির তৈরি পেট মোটা বড় পাত্র।
নাজেহাল - হয়রান। পেরেশান। জব্দ।
জয়িফ - দুর্বল। হীনবল। বৃদ্ধ। জরাজীর্ণ।
অসয়োস্তি - অস্বস্তি। মনের অশান্তি।
কুঁচো ছেলেমেয়ে - ছোট ছোট ছেলেমেয়ে।
উপযাচক - যে যেচে বা স্ব-উদ্যোগী হয়ে কিছু করে।
উর্দি - সৈনিকদের জন্য নির্ধারিত পোশাক।

Content added By

পাঠের উদ্দেশ্য

293

মুক্তিযুদ্ধের সময়কার পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া।

Content added By

পাঠ-পরিচিতি

312

মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এই যুদ্ধে পাকিস্তানিদের অত্যাচারের দৃশ্য দেখে একজন কিশোর কীভাবে তাদের প্রতিরোধ করার জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়-শওকত ওসমানের 'তোলপাড়' গল্পে তাই ব্যক্ত হয়েছে। কিশোর সাবু গাঁয়ের সড়কে শহর থেকে পালানো হাজার হাজার মানুষ দেখে অবাক হয়। অত্যাচারিত ও ক্লান্ত মানুষদের মুড়ি বা পানি পান করিয়ে সে সান্ত্বনা খোঁজে। সাবু দেখতে পায়, নারী, শিশু, বৃদ্ধ নির্বিশেষে সবাই শহর থেকে পালাচ্ছে। পাকিস্তানিরা নির্বিচারে সবাইকে হত্যা করছে বলে তারা সংবাদ পায়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এই নিষ্ঠুরতা অনুভব করে সাবু ক্ষুব্ধ হয়। শহরত্যাগী মানুষের অসহায়ত্ব ও দুঃখ-কষ্ট দেখে তার মন বেদনায় ভরে ওঠে। অত্যাচার মোকাবিলা করার জন্য তার কিশোর মন আন্দোলিত হয়ে ওঠে।

Content added By

লেখক-পরিচিতি

313

শওকত ওসমানের প্রকৃত নাম আজিজুর রহমান। তাঁর জন্ম পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার সবল সিংহপুর গ্রামে ১৯১৭ সালে। দীর্ঘদিন তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। তবে অধ্যাপনা-জীবনে প্রবেশ করার আগে তাঁর চাকরিজীবন ছিল বিচিত্র। শওকত ওসমান বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক। ছোটদের জন্য তিনি যে সব গ্রন্থ লিখেছেন সেগুলো হচ্ছে: 'ওটন সাহেবের বাংলো', 'ডিগবাজি', 'মসকুইটো ফোন', 'তারা দুইজন', 'ক্ষুদে সোশালিস্ট', 'ছোটদের নানা গল্প', 'কথা রচনার কথা', 'পঞ্চসঙ্গী' ইত্যাদি। তিনি বেশ কয়েকটি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। পুরস্কারগুলো হচ্ছে: আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক, ফিলিপ্স সাহিত্য পুরস্কার ইত্যাদি। ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

Content added By

কর্ম-অনুশীলন

372

বন্ধুরা চলো আমাদের এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের সময় কী কী ঘটেছিল তা স্থানীয় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে জেনে নিই। তাঁদের অভিজ্ঞতাগুলো খাতায় লিখে রাখি। তারপর অভিজ্ঞতাগুলো সাজিয়ে একটি গল্প লেখার চেষ্টা করি।

চলো তাহলে গল্পটি লেখার চেষ্টা করি (এ জন্য আলাদা কাগজ ব্যবহার করতে পারি)।

ভোর রাতেই হাফিজ ভাই খবর নিয়ে এলেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দু-এক দিনের মধ্যে গ্রামে হানা দিতে পারে। খবরটি শুনেই গ্রামে বিভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়া শুরু হলো।...
Content added By

আকাশ (পঞ্চম অধ্যায়) (আবদুল্লাহ আল-মুতী)

3.4k

খোলা জায়গায় মাথার ওপরে দিনরাত আমরা আকাশ দেখতে পাই। গাছপালা, নদীনালা দুনিয়ায় কোথাও আছে, কোথাও নেই। এমনকি ঘরবাড়ি, জীবজন্তু, মানুষও সব জায়গায় না থাকতে পারে। কিন্তু আকাশ নেই, ভূপৃষ্ঠে এমন জায়গা কল্পনা করা শক্ত।

দিনের বেলা সোনার থালার মতো সূর্য তার কিরণ ছড়ায় চারপাশে। এমনি সময়ে সচরাচর আকাশ নীল। কখনো সাদা বা কালো মেঘে ঢেকে যায় আকাশ। ভোরে বা সন্ধ্যায় আকাশের কোনো কোনো অংশে নামে রঙের বন্যা। কখনো-বা সারা আকাশ ভেসে যায় লাল আলোতে। রাতের আকাশ সচরাচর কালো, কিন্তু সেই কালো চাঁদোয়ার গায়ে জ্বলতে থাকে রুপালি চাঁদ আর অসংখ্য ঝকঝকে তারা আর গ্রহ।

আগেকার দিনে লোকে ভাবতো, আকাশটা বুঝি পৃথিবীর ওপর একটা কিছু কঠিন ঢাকনা। কখনো তারা ভাবতো, আকাশটা পরতে পরতে ভাগ করা।

আজ আমরা জানি, আকাশের নীল চাঁদোয়াটা সত্যি সত্যি কঠিন কোনো জিনিসের তৈরি নয়। আসলে এ নিতান্তই গ্যাস-ভরতি ফাঁকা জায়গা। হরহামেশা আমরা যে আকাশ দেখি তা আসলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ঢাকনা। সেই বায়ুমণ্ডলে রয়েছে নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড এমনি গোটা কুড়ি বর্ণহীন গ্যাসের মিশেল। আর আছে পানির বাষ্প আর ধুলোর কথা।

আকাশ যদি বর্ণহীন গ্যাসের মিশেল, তবে তা নীল দেখায় কেন? মাঝে মাঝে সাদা আর লাল রঙের খেলাই- বা দেখি কী করে? আসলে সাদা মেঘে রয়েছে জলীয়বাষ্প জমে তৈরি অতি ছোট ছোট অসংখ্য পানির কণা। কখনো মেঘে এসব কণার গায়ে বাষ্প জমার ফলে ভারি হয়ে বড় পানির কণা তৈরি হয়। তখন সূর্যের আলো তার ভেতর দিয়ে আসতে পারে না, আর তাই সে মেঘের রং হয় কালো।

কিন্তু সারাটা আকাশ সচরাচর নীল রঙের হয় কী করে? আকাশ নীল দেখায় বায়ুমণ্ডলে নানা গ্যাসের অণু ছড়িয়ে আছে বলে। এইসব গ্যাসের কণা খুব ছোট মাপের আলোর ঢেউ সহজে ঠিকরে ছিটিয়ে দিতে পারে। এই ছোট মাপের আলোর ঢেউগুলোই আমরা দেখি নীল রঙ হিসেবে। অর্থাৎ পৃথিবীর ওপর হাওয়ার স্তর আছে বলেই পৃথিবীতে আকাশকে নীল দেখায়।

সকাল-দুপুর-সন্ধ্যায় আকাশের রঙ হুবহু এক রকম থাকে না। এরও কারণ হলো পৃথিবীর ওপরকার বায়ুমণ্ডল। সূর্য থেকে যে আলো আমাদের চোখে পড়ে, তাকে পৃথিবীর ওপরকার বিশাল হাওয়ার স্তর পেরিয়ে আসতে হয়। দুপুর বেলা এই আলো আসে সরাসরি অর্থাৎ প্রায় লম্বভাবে হাওয়ার স্তর ফুঁড়ে। কিন্তু সকালে বা সন্ধ্যায় এই আলো আসে তেরছাভাবে হাওয়ার স্তর পেরিয়ে। তাতে আলোকে হাওয়ার কণা ডিঙাতে হয় দুপুরের তুলনায় অনেক বেশি।
সকালে বা সন্ধ্যায় মেঘ আর হাওয়ার ধুলোর কণার ভেতর দিয়ে লম্বা পথ পেরিয়ে আসতে পারে শুধু সূর্যের লাল আলোর ঢেউগুলো। সে মেঘকে তখন দেখায় লাল। ঘন বৃষ্টি-মেঘের বড় বড় কণারা যখন আকাশ ছেয়ে ফেলে, তখন তার ভেতর দিয়ে আলো পেরিয়ে আসতে পারে না, তাই সে মেঘকে দেখায় কালো।
আগেকার দিনে আমাদের ওপরকার আকাশ নিয়ে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন শূন্যে বেলুন পাঠিয়ে বা যন্ত্রপাতিসুদ্ধ রকেট পাঠিয়ে। আজ মানুষ নিজেই মহাকাশযানে চেপে সফর করছে পৃথিবীর উপরে বহু দূর পর্যন্ত। পৃথিবী ছাড়িয়ে যেতে পেরেছে চাঁদে। পৃথিবীর উপর দেড়শ দুশ মাইল বা তারো অনেক বেশি উপর দিয়ে ঘুরছে অসংখ্য মহাকাশযান। যেখান দিয়ে ঘুরছে সেখানে হাওয়া নেই বললেই চলে।
মহাকাশযান থেকে দিনরাত তোলা হচ্ছে পৃথিবীর ছবি। জানা যাচ্ছে কোথায় কখন আবহাওয়া কেমন হবে, কোন দেশে কেমন ফসল হচ্ছে। মহাকাশযান থেকে ঠিকরে দেওয়া হচ্ছে টেলিফোন আর টেলিভিশনের সংকেত। তাই দূরদেশের সঙ্গে যোগাযোগ আজ অনেক সহজ হয়ে উঠেছে ।

Content added || updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

বিভিন্ন গ্যাস ও পানি
বিভিন্ন গ্যাস ও ধূলিকণা
পানি ও ধূলিকণা
নাইট্রোজেন
বিজ্ঞানমনষ্ক
ভাবপ্রবণ
কল্পনাপ্রবণ
রহস্যময়
ধুলোর কণা
অসংখ্য পানির কণা
কার্বনডাই অক্সাইড
নাইট্রোজেন

শব্দার্থ ও টীকা

340

ভূপৃষ্ঠ - পৃথিবীর উপরের অংশ।
সচরাচর - সাধারণত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। প্রায়শ।
চাঁদোয়া - শামিয়ানা। কাপড়ের ছাউনি।
পরতে পরতে - স্তরে স্তরে। ভাঁজে ভাঁজে।
কণা - বস্তুর অতি সূক্ষ্ম বা ক্ষুদ্র অংশ।
হরহামেশা - সবসময়। সর্বদা।
বায়ুমণ্ডল - পৃথিবীর উপরে যতদূর পর্যন্ত বাতাস রয়েছে।
নাইট্রোজেন - বর্ণ ও গন্ধ নেই এমন একটি মৌলিক গ্যাস, বাতাসের প্রধান উপাদান।
অক্সিজেন - জীবের প্রাণ বাঁচানো ও আগুন জ্বালানোর জন্য দরকারি বর্ণহীন, স্বাদহীন, গন্ধহীন মৌলিক গ্যাস।
কার্বন ডাই অক্সাইড - কার্বন পুড়ে কার্বন ডাই অক্সাইড তৈরি হয়। প্রাণীর নিশ্বাসের সঙ্গে বের হওয়া বর্ণগন্ধহীন গ্যাস।
মিশেল - বিভিন্ন বস্তুর মিলন। মিশ্রণ।
জলীয়বাষ্প - পানির বায়বীয় অবস্থা।
ঠিকরে - ছিটকে। ছড়িয়ে।
হুবহু - অবিকল। একেবারে একই রকম।
স্তর - একের ওপর আর এক-এমনিভাবে সাজানো। ধাপ।
লম্বভাবে - খাড়াভাবে।
ফুঁড়ে - ভেদ করে।
তেরছা - বাঁকা। আড়। হেলানো।
রকেট - গ্রহে-উপগ্রহে যেতে পারে এমন মহাকাশযান।
মহাকাশযান - মহাকাশে যাতায়াতের বাহন।
সংকেত - ইঙ্গিত। ইশারা।

Content added By

পাঠের উদ্দেশ্য

324

বিজ্ঞানচেতনা জাগ্রত করা।

Content added By

পাঠ-পরিচিতি

332

এক সময় আকাশকে মনে করা হতো মানুষের মাথার উপরে বিশাল একটি ঢাকনা বলে। আসলে আকাশ কোনো ঢাকনা নয়। এ হচ্ছে বায়ুর স্তর। বাতাসে প্রায় বিশটি বর্ণহীন গ্যাস মিশে আছে। বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন গ্যাসের অণু ছড়িয়ে আছে বলে আকাশ নীল দেখায়। সকাল বা সন্ধ্যায় মেঘ ও বাতাসের ধুলোকণার মধ্যে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে পারে শুধু সূর্যের লাল আলো। তাই এ সময় মেঘ লাল দেখায়। ঘন বৃষ্টি ও মেঘে ছেয়ে ফেললে আকাশ দেখার কালো। শূন্যে মহাকাশযান পাঠিয়ে বিজ্ঞানীরা নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন। পৃথিবীর অন্তত কয়েক শ' মাইল ওপর দিয়ে পাঠানো মহাকাশযান থেকে প্রেরিত অসংখ্য ফটো বা ভিডিও থেকে মানুষ আবহাওয়ার খবর পাচ্ছে। একই কারণে টেলিভিশন, টেলিফোন, মোবাইল ফোন ইত্যাদিতে সংকেত পাঠিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত করা সম্ভব হয়েছে।

Content added By

লেখক-পরিচিতি

281

শিশুদের জন্য বিজ্ঞানবিষয়ক সাহিত্য রচনা করে আবদুল্লাহ আল-মুতী বিখ্যাত হয়ে আছেন। তিনি সিরাজগঞ্জ জেলার ফুলবাড়িতে ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। বিজ্ঞানের অনেক জটিল রহস্যময় অজানা দিককে তিনি আকর্ষণীয় ও সাবলীল ভাষায় তুলে ধরেছেন।
ছোটদের জন্যে তাঁর লেখা বইগুলো হচ্ছে: 'এসো বিজ্ঞানের রাজ্যে', 'অবাক পৃথিবী', 'আবিষ্কারের নেশায়', 'রহস্যের শেষ নেই', 'জানা অজানার দেশে', 'সাগরের রহস্যপুরী', 'আয় বৃষ্টি বোঁপে', 'ফুলের জন্য ভালোবাসা' ইত্যাদি।
সাহিত্য রচনা ও বিজ্ঞান সাধনার জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ইউনেসকো আন্তর্জাতিক কলিঙ্গ পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তিনি ১৯৯৮ সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

Content added By

কর্ম-অনুশীলন

330

১. এসো শিক্ষার্থীরা, আমরা স্কুলে আসা দৈনিক পত্রিকার সাপ্তাহিক বিজ্ঞান পাতাগুলো সংগ্রহ করি। তারপর পাতাগুলোর কয়েকটি বিষয় আমরা দলে ভাগ হয়ে পাঠ করি। পঠিত বিষয়ে আমাদের জ্ঞান ও ধারণা শ্রেণিকক্ষে দলীয়ভাবে পোস্টার পেপারের মাধ্যমে উপস্থাপন করি।

Content added By

মাদার তেরেসা (ষষ্ঠ অধ্যায়) (সন্‌জীদা খাতুন)

4.3k

মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সবসময় তেমন দেখা যায় না। আবার বিভিন্ন যুগে এমন মানুষও পৃথিবীতে আসেন যাঁরা মানুষের সেবাতেই প্রাণমন সব ঢেলে দেন। ভালোবাসা দিয়ে তাঁরা জয় করে নেন দুনিয়া। মাদার তেরেসা ছিলেন তেমনি একজন অসাধারণ মানবদরদি।

মাদার তেরেসা জন্মেছিলেন অনেক দূরের দেশ আলবেনিয়ার স্কপিয়েতে। ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দের ছাব্বিশে আগস্ট তাঁর জন্ম। পিতা ছিলেন বাড়িঘর তৈরির কারবারি, নাম নিকোলাস বোজাঝিউ। মায়ের নাম দ্রানাফিল বার্নাই। পারিবারিক পদবি অনুসারে কন্যার নাম রাখা হয় অ্যাগনেস গোনজা বোজাঝিউ। তিন ভাইবোনের মধ্যে অ্যাগনেস ছিলেন ছোট। বড় হয়ে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণের সময় তাঁর নাম হলো মাদার তেরেসা।

তেরেসা যখন খুব ছোট, তখন ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা জুড়ে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছিল। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলেছিল এই যুদ্ধ। ইতিহাসে এই যুদ্ধকে বলা হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এতে তেরেসার কোমল মনে খুব আঘাত লেগেছিল। এসময়ে বাবার মৃত্যু পরিবারেও বিপর্বয় ঘটিয়েছিল। দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে বড় হচ্ছিলেন তেরেসা। অল্পবয়সে তাঁর ভেতরে ইচ্ছা জাগে মানুষের সেবা করবেন, তাদের কষ্ট লাঘব করবেন। তেরেসার বয়স যখন আঠারো, তখন তিনি 'লরেটো সিস্টার্স' নামে খ্রিষ্টান মিশনারি দলে যোগ দেন। ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে এরা কাজ করতেন। দার্জিলিং-এ 'লরেটো সিস্টার্স'দের আশ্রমে তিন বছর তিনি নান হওয়ার প্রশিক্ষণ নেন। বাঙালিদের মধ্যে কাজ করার জন্য বাংলা ভাষাও রপ্ত করেন। এরপর কলকাতায় সেন্ট মেরি'জ স্কুলে শিক্ষকতার দায়িত্ব পান। ১৭ বছর সেখানে কাজ করেন তিনি। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সেবার আগ্রহ জাগাতে চেষ্টা করতেন তেরেসা। সপ্তাহে একদিনের টিফিনের পয়সা বস্তির দরিদ্র শিশুদের জন্য খরচ করতে তিনি উৎসাহ দিতেন তাদের।
বাংলার মানুষের দুঃখ-দুর্দশা মাদার তেরেসাকে খুব বিচলিত করছিল। মানুষের সেবায় আরও কাজ করার জন্য মনে খুব তাগিদ অনুভব করছিলেন। অবশেষে ১৯৪৮ সালে লরেটো থেকে বিদায় নিয়ে তিনি শুরু করলেন একেবারে গরিবদের সেবার কাজ। গাউন ছেড়ে পরলেন শাড়ি-বাঙালি নারীর পোশাক। সেই থেকে তিনটির বেশি শাড়ি তার কখনো ছিল না। একটি পরার, একটি ধোয়ার, আরেকটি হঠাৎ দরকার কিংবা কোনো উপলক্ষের জন্য রেখে দেওয়া। তাঁর হাতে টাকা-পয়সাও বিশেষ ছিল না। তবে মনে ছিল গরিব-দুখি মানুষের জন্য ভালোবাসা আর প্রবল এক আত্মবিশ্বাস।

কলকাতার এক অতি নোংরা বস্তিতে তিনি প্রথম স্কুল খুললেন। বেঞ্চ-টেবিল কিছু নেই, মাটিতে দাগ কেটে শিশুদের শেখাতে লাগলেন বর্ণমালা। অসুস্থদের সেবার জন্য খুললেন চিকিৎসাকেন্দ্র। ধীরে ধীরে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন অনেক মানুষ। মাদার তেরেসার কাজের পরিধি ক্রমাগত বেড়ে চলল। তাঁর সঙ্গে যোগ দিলেন আরও অনেক নান। তাদের নিয়ে তিনি গড়লেন মানবসেবার সংঘ- 'মিশনারিজ অব চ্যারিটি'।

সবচেয়ে যারা গরিব, সবচেয়ে করুণ যাদের জীবন, তাদের সেবা করার ব্রত ছিল মাদার তেরেসার। মৃত্যুমুখী অসহায় মানুষের সেবার জন্য তিনি ১৯৫২ সালে কলকাতার কালিঘাটে 'নির্মল হৃদয়' নামে এক ভবন প্রতিষ্ঠা করেন। কলকাতায় ফুটপাতে সহায়-সম্বলহীন বহু মানুষের বাস। অসুখে ধুঁকে ধুঁকে তাঁদের অনেকের প্রায় মৃত্যুদশা। মরণাপন্ন এইসব মানুষকে বুকে তুলে নেন মাদার তেরেসা। নির্মল হৃদয়ে এনে মমতাময়ী মা কিংবা বোনের মতো তাদের সেবাযত্ন করেন।

রাস্তা থেকে তুলে আনা অনাথ শিশুদের আশ্রয় দিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'শিশুভবন'। শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য স্থাপন করেন 'নবজীবন আবাস'।

মাদার তেরেসার আরেকটি বড় কাজ কুষ্ঠরোগীদের আবাসন-'প্রেমনিবাস' প্রতিষ্ঠা। ভারতের টিটাগড়ে তিনি প্রথম এই কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। পরে এর আরো অনেক শাখা গড়ে তোলা হয়। কুষ্ঠরোগীদের শরীরে দুর্গন্ধময় দগদগে ঘা হয় বলে সমাজের অনেকে রোগীকে পরিত্যাগ করে। অসুখটা ছোঁয়াচে ভেবে রোগীর কাছ থেকে সবাই দূরে থাকে। ফলে কুষ্ঠরোগীদের জীবন হয়ে ওঠে খুব কষ্টের। মাদার তেরেসা নিজের হাতে কুষ্ঠরোগীদের সেবা করতেন। তাঁদের ঘা ধুইয়ে স্নান করিয়ে দিতেন। তাঁর সেবাকর্ম অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করত।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে প্রায় এক কোটি লোক ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের অত্যাচারে তারা দেশ ত্যাগ করেছিল। শরণার্থী শিবিরে এত বিপুল সংখ্যক মানুষ রাখা খুব সহজ কাজ ছিল না। সেই সময়ে শিবিরের দুর্গত মানুষের সেবার কাজ করেন মাদার তেরেসা। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি প্রথম ঢাকায় আসেন। বাংলাদেশে শুরু করেন তাঁর 'মিশনারিজ অব চ্যারিটি'-র সেবাকাজ। ঢাকার ইসলামপুরে প্রথম শাখা গড়ে তোলা হয়। এরপর খুলনা, সাতক্ষীরা, বরিশাল, সিলেট আর কুলাউড়াতে 'নির্মল হৃদয়' ও 'শিশুভবন' প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯১ সালের প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়ের পর একাশি বছর বয়সী মাদার তেরেসা বাংলাদেশে ছুটে আসেন। তিনি চেয়েছিলেন নিজহাতে দুর্গত মানুষের ত্রাণের কাজ করবেন। ভালোবাসা দিয়ে মানুষের জীবনকে শান্তিময় করার জন্য কাজ করে গেছেন মাদার তেরেসা। সেবাকাজে মানুষকেই সবচেয়ে বড় করে দেখেছিলেন তিনি। ধর্মের ফারাক, দেশের ভিন্নতা, জাতির পার্থক্য তিনি কখনো বিবেচনায় নেন নি। তাই সব দেশের সব ধর্মের মানুষের ভালোবাসা তিনি পেয়েছেন। সেবাকাজের জন্য বহু সম্মাননা তিনি লাভ করেছেন, তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো নোবেল পুরস্কার। সে পুরস্কার শান্তির কাজের জন্য। জীবনে কোনো পুরস্কারের অর্থই নিজের জন্য ব্যয় করেন নি মাদার তেরেসা, নোবেল পুরস্কারের অর্থও দান করেছেন দুঃখীজনের জন্য। সেই সাথে আরেকটি কাজ করেছিলেন। নোবেল পুরস্কার প্রদান উপলক্ষে সুইডেনের নোবেল কমিটি এক ভোজসভার আয়োজন করে। মাদার তেরেসা অনুরোধ করেছিলেন ভোজসভা বাতিল করে সেই অর্থ ক্ষুধার্ত মানুষদের দেওয়ার জন্যে। এই সংবাদ জানতে পেরে সুইডেন ও অন্যান্য দেশের মানুষ এগিয়ে আসেন। এঁদের মধ্যে স্কুলের অনেক ছাত্রছাত্রীও ছিল। তারা মাদার তেরেসাকে যে সাহায্য করেছিলেন সেটা ছিল নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্যের অর্ধেক।
১৯৯৭ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর কলকাতায় এই সেবাব্রতীর মৃত্যু হয়।
সারা জীবন মাদার তেরেসা মানুষের সেবা করেছেন, সেই সাথে মানুষের সেবায় এগিয়ে আসতে অন্যদের অনুপ্রাণিত করেছেন। নীলপাড় সাদা শাড়িপরা ছোটখাটো এই মানুষটিকে তাই দুনিয়ার সবাই এক ডাকে চেনে। মানুষের মনে তিনি বেঁচে থাকবেন চিরকাল।

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

মানবসেবীদের
কুষ্ঠরোগীদের
মুমূর্ষু রোগীদের
অনাথ শিশুদের

শব্দার্থ ও টীকা

373

মানবদরদি - মানুষের জন্য যার দরদ বা সমবেদনা আছে।
সন্ন্যাসব্রত - সংসারজীবন ত্যাগ করে তপস্যা ও সংযমের সাধনা।
মিশনারি - ধর্মপ্রচারক।
নান - গির্জা বাসিনী। সন্ন্যাসিনী। Nun.
অনাথ - মা-বাবা এবং অভিভাবক নেই যে-সব শিশুর। এতিম।
প্রশিক্ষণ - হাতে-কলমে বিশেষ শিক্ষা।
রপ্ত - আয়ত্ত। অভ্যাসের সাহায্যে শিখে নেয়া।
গাউন - মহিলাদের বিশেষ ধরনের পোশাক।
মিশনারিজ অব চ্যারিটি - পরের উপকারের উদ্দেশ্যে স্থাপিত প্রতিষ্ঠান, মানবসেবা সংঘ।
সেবাব্রতী - মানুষের সেবা করাই যার ব্রত।
ব্রত - সৎকাজ করার জন্যে কঠিন সাধনা ও ত্যাগ।
আবাসন - বসবাসের ব্যবস্থা।
পাকিস্তানিদের দোসর - ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী; রাজাকার, আলবদর ইত্যাদি বাহিনীর সদস্যবৃন্দ।
সম্মাননা - সম্মান দেখানো। সম্মানের স্বীকৃতি প্রদান।

Content added By

পাঠের উদ্দেশ্য

306

নারী ও নারীর কর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলা, গরিব ও দুঃখী মানুষের সেবার প্রতি আগ্রহী করে তোলা।

Content added By

পাঠ-পরিচিতি

286

মাদার তেরেসা একজন অসাধারণ মানবসেবী। তাঁর জন্মস্থান সুদূর আলবেনিয়া হলেও তিনি অবিভক্ত ভারতের বাংলা অঞ্চলের মানুষের দুঃখ দুর্দশায় বিচলিত হয়েছিলেন। এ কারণে তিনি গরিব ও অসুস্থ মানুষের জন্য তৈরি করেন স্কুল ও চিকিৎসা কেন্দ্র। সমাজে অবহেলিত ও পরিত্যক্ত কুষ্ঠ রোগীদের তিনি নিজের হাতে সেবা করতেন, স্নান করাতেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় নেওয়া দুর্গত মানুষের সেবা করেন মাদার তেরেসা। পরে স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়ও খোলা হয় তাঁর মানবসেবা প্রতিষ্ঠান। দেশ, ধর্ম, জাতির পার্থক্য না করে সেবাকাজে মানুষকেই বড় করে দেখেছিলেন তিনি। এ জন্য সব দেশের এবং সব ধর্মের মানুষের কাছেই তিনি পেয়েছেন শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্মান। নোবেল পুরস্কার তাঁর তেমনই একটি অর্জন।

Content added By

লেখক-পরিচিতি

315

সন্জীদা খাতুন ১৯৩৩ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর সন্জীদা খাতুন প্রধানত প্রবন্ধকার এবং গবেষক। রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মী হিসেবে তাঁর খ্যাতি আছে। সন্জীদা খাতুন সাহিত্য ও গবেষণাকর্মের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছেন। সংস্কৃতিক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য অর্জন করেছেন বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে 'সত্যেন্দ্র-কাব্য পরিচয়', 'রবীন্দ্রসংগীতের ভাবসম্পদ', 'ধ্বনি থেকে কবিতা', 'অতীত দিনের স্মৃতি' উল্লেখযোগ্য।

Content added By

কর্ম-অনুশীলন

1k

১. মানবসেবায় অবদান রেখেছেন এমন পাঁচজন ব্যক্তির কর্মজগৎ নিয়ে একটি প্রবন্ধ রচনা কর।
২. তোমার পরিচিত যে-সব মানুষ ছোটখাটো দান ও সেবার মধ্যদিয়ে মানুষের কল্যাণ সাধন করতে চেষ্টা করছেন তাদের সম্পর্কে লেখ।

Content added By

আমাদের লোকশিল্প (সপ্তম অধ্যায়) (কামরুল হাসান)

3.6k

খাদ্যশস্যের পরেই বাংলাদেশের মানুষের জীবনের সঙ্গে যে জিনিসটি অতি নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে, তা হলো এখানকার কুটিরশিল্প। এক সময়ে ঘর-গৃহস্থালির নিত্য ব্যবহারের প্রায় সব পণ্যই এদেশের গ্রামের কুটিরে তৈরি হতো। আজও অনেক কিছুই হয়। এগুলো কুটিরশিল্পের মাধ্যমে তৈরি হলেও শিল্পগুণ বিচারে এ ধরনের সামগ্রী লোকশিল্পের মধ্যে গণ্য।

আমাদের দেশের বিভিন্ন লোকশিল্পের কতকগুলো এক সময়ে এমন উচ্চমানের ছিল যে, আজও আমরা সেসব জিনিসের কথা স্মরণ করে গর্ববোধ করি।
প্রথমে বলতে হয় ঢাকাই মসলিনের কথা। ঢাকা শহরের অদূরে ডেমরা এলাকার তাঁতিদের এ অমূল্য সৃষ্টি এককালে দুনিয়া জুড়ে তুলেছিল প্রবল আলোড়ন। ঢাকার মসলিন তৎকালীন মোগল বাদশাহদের বিলাসের বস্তু ছিল। মসলিন কাপড় এত সূক্ষ্ম সুতা দিয়ে বোনা হতো যে, ছোট্ট একটি আংটির ভিতর দিয়ে অনায়াসে কয়েকশ গজ মসলিন কাপড় প্রবেশ করিয়ে দেয়া সম্ভব ছিল। শুধু কারিগরি দক্ষতায় নয়, এ ধরনের কাপড় বুনবার জন্য শিল্পী মন থাকাও প্রয়োজন। আজ সেই মসলিন নেই। তবে মসলিন যারা বুনত, তাদের বংশধররা যুগ যুগ ধরে এ শিল্পধারা বহন করে আসছে বলে জামদানি শাড়ি আমরা আজও দেখতে পাই। বর্তমান যুগে জামদানি শাড়ি দেশে-বিদেশে শুধু পরিচিতই নয়, গর্বের বস্তু।
এমনি আর একটি গ্রামীণ লোকশিল্প আজ লুপ্তপ্রায় হলেও কিছু কিছু নমুনা পাওয়া যায়। এটি হলো নকশিকাঁথা। এক সময় বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে এ নকশিকাঁথা তৈরির রেওয়াজ ছিল। এক একটি সাধারণ আকারের নকশিকাঁথা সেলাই করতেও কমপক্ষে ছয় মাস লাগত। বর্ষাকালে যখন চারদিকে পানি থৈ থৈ করে, ঘর থেকে বাইরে বের হওয়া যায় না, এমন মৌসুমই ছিল নকশিকাঁথা সেলাইয়ের উপযুক্ত সময়। মেয়েরা সংসারের কাজ সাঙ্গ করে দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে পাটি বিছিয়ে পানের বাটাটি পাশে নিয়ে পা মেলে বসতেন এ বিচিত্র নকশা তোলা কাঁথা সেলাই করতে। পড়শিরাও সুযোগ পেলে আসত গল্প করতে। আপন পরিবেশ থেকেই মেয়েরা তাঁদের মনের মতো করে কাঁথা সেলাইয়ের অনুপ্রেরণা পেতেন। এমনি এক একটি কাঁথা সেলাই কত গল্প, কত হাসি, কত কান্নার মধ্যে দিয়ে শেষ হতো তা বলা যায় না। শুধু কতকগুলো সূক্ষ্ম সেলাই আর রং-বেরঙের নকশার জন্যই নকশিকাঁথা বলা হয় না বরং কাঁথার প্রতিটি সুচের ফোঁড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক-একটি পরিবারের কাহিনি, তাদের পরিবেশ, তাদের জীবনগাথা।

আমাদের দেশের লোকশিল্প বিভিন্ন রূপে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে প্রাধান্য পেয়েছে। তাঁতশিল্প বাংলাদেশের সব এলাকাতেই আছে; তবে ঢাকা, টাংগাইল, শাহজাদপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম এলাকায় তাঁতশিল্পের মৌলিক বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

জামদানি শাড়ির কথা আমরা আলোচনা করেছি। নারায়ণগঞ্জ জেলার নওয়াপাড়া গ্রামেই জামদানি কারিগরদের বসবাস। শতাব্দীকাল ধরে এ তাঁতশিল্প বিস্তার লাভ করেছে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী এ এলাকায়। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ শীতলক্ষ্যা নদীর পানির বাষ্প থেকে যে আর্দ্রতার সৃষ্টি হয় তা জামদানি বোনার জন্য শুধু উপযোগীই নয়, বরং এক অপরিহার্য বস্তু বলা চলে। ভৌগোলিক অবস্থান, আবহাওয়া এবং পরিস্থিতির জন্য শুধু অতীতের তাঁতিদের তাঁতশিল্পই নয়, বর্তমানের বড় বড় কাপড়ের কারখানাও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে গড়ে উঠেছে।
কুমিল্লা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে প্রস্তুত খাদি বা খদ্দরের সমাদর শুধু গ্রামজীবনেই নয়, শহরের আধুনিক সমাজেও যথেষ্ট রয়েছে। খাদি কাপড়ের বিশেষত্ব হচ্ছে, এর সবটাই হাতে প্রস্তুত। তুলা থেকে হাতে সুতা কাটা হয়। গ্রামবাসীরা অবসর সময়ে সুতা কাটে। এদের বলা হয় কাটুনি। গ্রামে বাড়ির আশেপাশে তুলার গাছ লাগানোর রীতি আছে। সেই গাছের তুলা দিয়ে সুতা কাটা ও হস্ত চালিত তাঁতে এসব সুতায় যে কাপড় প্রস্তুত করা হয়, সেই কাপড়ই প্রকৃত খাদি বা খদ্দর। স্বদেশি আন্দোলনের যুগে বিদেশি কাপড় বর্জন করে দেশি কাপড় ব্যবহারের যে আদর্শ প্রবর্তিত হয়েছিল তারই সাফল্যের স্বাক্ষর এই খাদি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, বান্দরবান, রামগড় এলাকার চাকমা, কুকি ও মুরং মেয়েরা এবং সিলেটের মাছিমপুর অঞ্চলের মণিপুরি মেয়েরা তাদের নিজেদের ও পুরুষদের পরিধেয় বস্ত্র বুনে থাকে। এ কাপড়গুলো সাধারণত মোটা ও টেকসই হয়। নকশা, রং ও বুনন কৌশল সবই তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য অনুযায়ী হয়।

বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে কাঁসা ও পিতলের বাসনপত্র এককালে বেশ প্রচলিত ছিল। আজও শত শত গ্রাম্য কারিগর তৈরি করে বিচিত্র ধরনের তৈজসপত্র। প্রথমে মাটির ছাঁচ করে তার মধ্যে ঢেলে দেয় গলিত কাঁসা। ধীরে ধীরে এ গলিত ধাতু ঠান্ডা হয়ে আসে। তখন ওপর থেকে মাটির ছাঁচটি ভেঙে ফেললেই ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে বদনা, বাটি, গ্লাস, থালা ইত্যাদি। তারপর এগুলো পালিশ করা হয়। এ ধরনের বাসনে নানারকম ফুল পাতার নকশা বা ফরমাশকারীর নাম খোদাই করা থাকে। এমনকি আজকাল অতি আধুনিক গৃহসজ্জার সামগ্রী হিসেবে তামা-পিতলের ঘড়া, থালা, ফুলদানি ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।
পোড়ামাটির কাজের ঐতিহ্য এদেশে বহু যুগের। মাটির কলস, হাঁড়ি, পাতিল, সানকি, ফুলদানি, দইয়ের ভাঁড়, রসের ঠিলা সন্দেশ ও পিঠার ছাঁচ, টেপা পুতুল, হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী ইত্যাদির মূর্তি গড়বার কাজে বাংলাদেশের পালপাড়া ও কুমোরপাড়ার অধিবাসীরা সারা বছরই ব্যস্ত থাকে। আধুনিক রুচির ফুলদানি, ছাইদানি, চায়ের সেট, কৌটা, বাক্স বা ঘর সাজাবার নানা ধরনের শৌখিন সামগ্রী সব কিছুই মাটি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। এ ছাড়া পুরাকালের মসজিদ বা মন্দিরের গায়ে যেসব নকশাদার ইট দেখা যায় তা এদেশের লোকশিল্পের এক অতুলনীয় নিদর্শন।

প্রতীকধর্মী মাটির টেপা পুতুলগুলোর মধ্যে শত শত বছর পূর্বের পাল বা কুমোরদের যে কারিগরিবিদ্যা এবং শিল্পীমনের পরিচয় পাওয়া যায়, তা অভাবনীয়।
কাঠের কাজের খুব বেশি শিল্পগুণ আজকাল দেখা না গেলেও অতীতের কিছু কিছু নমুনা যা দেখতে পাওয়া যায় তা থেকে অনুমান করা যায় যে, এ দেশে এক সময় গৃহনির্মাণের কাজে কারুকার্যে ভূষিত কাঠের ব্যবহার ছিল। বিশেষ করে পুরাতন খাট-পালঙ্ক, খুঁটি-দরজা ইত্যাদির নমুনা আজও দেখা যায়। এ ধরনের কাজকে বলা হয় হাসিয়া। বরিশালের কাঠের নৌকার কাজও বেশ নিপুণতার দাবি রাখে।
খুলনার মাদুর এবং সিলেটের শীতলপাটি সকলের কাছে পরিচিত। গ্রীষ্মকালে ব্যবহারে আরামদায়ক বলেই নয়, শীতলপাটির নকশা একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যের পরিচায়ক। অতীতে শীতলপাটির বহু দক্ষ কারিগর ছিল। এ শিল্পীদের দিয়ে এককালে ঢাকার নবাব পরিবার হাতির দাঁতের শীতলপাটি তৈরি করিয়েছিলেন। ঢাকার জাদুঘরে তা সংরক্ষিত আছে। এটি আমাদের লোকশিল্পের এক অতুলনীয় নিদর্শন।
আমাদের গ্রামের ঘরে ঘরে যে শিকা, হাতপাখা, ফুলপিঠা তৈরি করা হয়, তা মোটেই অবহেলার জিনিস নয়। এদের বিচিত্র নকশা, রং এবং কারিগরি সৌন্দর্যের যে নিদর্শন চোখে পড়ে তা শুধু আমাদের অতি আপন বস্তুই নয়, সৌন্দর্যের দিক দিয়েও এদের স্থান বহু উচ্চে। সাধারণ সামগ্রী হলেও যাঁরা এগুলো তৈরি করেন তাঁদের সৌন্দর্যপ্রিয়তার প্রকাশ ঘটে এসব জিনিসের মধ্য দিয়ে। শিকা গৃহস্থালির জিনিসপত্র ঝুলিয়ে রাখার জন্য তৈরি, একথা সকলেই জানে। শুধু শুধু প্রয়োজন মিটলেই মন ভরে না বলে সৌন্দর্যপ্রিয় মানুষ নানা নকশা জুড়ে দিয়ে তাকেও একটি বিশেষ শিল্পবস্তুতে পরিণত করেছে।
আমাদের দেশে বাঁশ অপ্রতুল নয়। বাঁশের নানারকম ব্যবহার ছাড়া আমাদের চলতেই পারে না। ছোটখাটো সামান্য হাতিয়ারের সাহায্যে আমাদের কারিগররা বাঁশ দিয়ে আজকাল আধুনিক রুচির নানা ব্যবহারিক সামগ্রী তৈরি করছে যা শুধু আমাদের নিজেদের দেশেই নয়, বিদেশেও বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ছাড়া সোলাশিল্পের উৎকৃষ্ট সৃজনশীল নমুনাও দেখা যায় পুতুল, টোপর ইত্যাদির মধ্যে।
কাপড়ের পুতুল তৈরি করা আমাদের দেশের মেয়েদের একটি সহজাত শিল্পগুণ। অনেকাংশে এসব পুতুল প্রতীকধর্মী। অবশ্য আজকাল বাস্তবধর্মী কাপড়ের পুতুল তৈরিও শুরু হয়েছে। এগুলো যেমন আমাদের দেশের ঐতিহ্য ও জীবনের প্রতিনিধিত্ব করে, তেমনি বিদেশি পয়সাও উপার্জন করে।
লোকশিল্প সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের দায়িত্ব আমাদের সকলের। বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর, শহরতলি এবং গ্রামের হাজার হাজার নারী-পুরুষ আছে, যারা কাজ করতে চায় অথচ কাজের অভাবে দিন দিন দারিদ্র্যের শিকার হচ্ছে। সুপরিকল্পিত উপায়ে এবং সুরুচিপূর্ণ লোকশিল্প প্রস্তুতির দিকে মনোযোগ দিলে তাদের সমস্যার কিছুটা সমাধান হবে।
আমাদের সকলকেই আজ আপন পরিবেশ এবং পরিস্থিতির দিকে শুধু চোখ দিয়ে তাকালে হবে না, হৃদয় দিয়েও তাকাতে হবে। লোকশিল্পের ভিতর দিয়ে হৃদয়-মনের প্রকাশ হলে তা বিদেশিদের হৃদয়ে সাড়া জাগাবে। এভাবে দেশে দেশে হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে তোলার কাজেও আমাদের লোকশিল্প সাহায্য করতে পারে।

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও

দিনমান বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একদিনের শিক্ষাসফরে কুমিল্লা যায়। শহরের কাপড়ের দোকানগুলো দেখে তারা মুগ্ধ হয়। কেউ কেউ স্মৃতির স্মারক হিসেবে রুমাল কেনে। শালবন বিহারে গিয়ে পুরনো ইটের কাজ দেখে তারা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগী হয়।

উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও

নবীনগর বালিকা বিদ্যালয়ের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির হাতে একজন ছাত্রী সুই আর রঙিন সুতা দিয়ে অপূর্ব সূক্ষ্ম সেলাই করা একটি কাঁথা তুলে দিল । গাঁয়ের মেয়েদের তৈরি কাঁথার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলেন অতিথি।

উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও

গত পয়লা বৈশাখে বাংলা একাডেমির মেলায় ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় এসে শুদ্ধতার চোখ আটকে যায়। একটি দোকানে মপানো রয়েছে চমৎকার সব গোলাপ ফুলের মালা। আর আছে C টোপর, ইত্যাদি। শুদ্ধতা মনোযোগ দিয়ে দেখল যে, কিছু লোক হাতের ছুরি দিয়ে একটি গাছের খন্ডের ভেতরের বস্তুকে খুব পাতলা করে কেটে কেটে নির্মাণ করছে চমৎকার সব ফুল-পাখি-প্রজাপতি।

ভাব ও কাজ
আমাদের লোকশিল্প
বাংলা নববর্ষ
শিল্পকলার নানা দিক

শব্দার্থ ও টীকা

354

নিবিড় - ঘনিষ্ঠ।
পণ্য - বিক্রি করা যায় এমন জিনিস।
লোকশিল্প - দেশি জিনিস দিয়ে দেশের মানুষের হাতে তৈরি শিল্পসম্মত দ্রব্য।
অমূল্য - মূল্য দিয়ে যার বিচার করা যায় না।
অপ্রতুল - যথেষ্ট নয়।
দক্ষতা - নিপুণতা, কুশলতা।
লুপ্তপ্রায় - লোপ পেতে বসেছে এমন।
রেওয়াজ - রীতি, পদ্ধতি, ধরন।
অনুপ্রেরণা - উদ্দীপনা, উৎসাহ।
জীবনকথা - জীবনের কাহিনি।
অপরিহার্য - যা এড়ানো যায় না, আবশ্যিক।
মণিপুরি - মণিপুর-সম্পর্কিত, মণিপুরে উৎপন্ন।
ঠিলা - মাটির কলসি, ঘট।
প্রতীকধর্মী - সংকেত বা ইঙ্গিতের মাধ্যমে বোঝায় এমন।
টোপর - হিন্দু সম্প্রদায়ের বরের মাথার মুকুট।
টেকসই - মজবুত।
ঐতিহ্য - অতীতের গর্ব ও গৌরবের বস্তু।
সংরক্ষণ - বিশেষভাবে রক্ষা করা।
সম্প্রসারণ - প্রসারিত করা, বিস্তার করা।
অনায়াসে - সহজে।
খোদাই করা - খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আঁকা।
ঘড়া - কলসি।
জীবনগাথা - জীবনের গল্প।
দারিদ্র্য - গরিব অবস্থা।
ফরমাশকারী - যিনি আদেশ করেন।
মৌসুম - কাল, ঋতু।
শহরতলি - শহরের কাছাকাছি এলাকা।
সহজাত - স্বাভাবিক।
সানকি - মাটির থালা।
সুপরিকল্পিত - ভালোভাবে পরিকল্পনা করা।
সুরুচিপূর্ণ - রুচিশীল।
সৌন্দর্যপ্রিয়তা - সুন্দরের প্রতি ভালোবাসা।
হস্তচালিত - হাতে চালিত।

Content added By

পাঠের উদ্দেশ্য

314

দৈনন্দিন জীবনে ঘর-গৃহস্থলির কাজে নিত্য ব্যবহার্য পণ্যসামগ্রীর অধিকাংশই যে একসময়ে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের কুটিরগুলোতে তৈরি হতো এবং এগুলো যে গুণে ও মানে অনন্য ছিলো সে সম্পর্কে তথ্যমূলক জ্ঞান অর্জন। প্রবন্ধটি পাঠের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই শিল্প সম্পর্কে আগ্রহ বাড়বে এবং তারা এগুলো সংরক্ষণেও আন্তরিক হবে।

Content added By

পাঠ-পরিচিতি

339

আমাদের লোকশিল্প' প্রবন্ধটি 'আমাদের লোককৃষ্টি' গ্রন্থ থেকে গৃহীত হয়েছে। লেখক এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের লোকশিল্প ও লোক-ঐতিহ্যের বর্ণনা দিয়েছেন। এ বর্ণনায় লোকশিল্পের প্রতি তাঁর গভীর মমত্ববোধের পরিচয় রয়েছে। আমাদের নিত্যব্যবহার্য অধিকাংশ জিনিসই এ কুটিরশিল্পের ওপর নির্ভরশীল। শিল্পগুণ বিচারে এ ধরনের শিল্পকে লোকশিল্পের মধ্যে গণ্য করা যেতে পারে।
পূর্বে আমাদের দেশে যে সমস্ত লোকশিল্প তৈরি হতো তার অনেকগুলোই অত্যন্ত উচ্চমানের ছিল। ঢাকাই মসলিন তার অন্যতম। ঢাকাই মসলিন অধুনা বিলুপ্ত হলেও ঢাকাই জামদানি শাড়ি অনেকাংশে সে স্থান অধিকার করেছে। বর্তমানে জামদানি শাড়ি দেশে-বিদেশে পরিচিত এবং আমাদের গর্বের বস্তু।

নকশি কাঁথা আমাদের একটি গ্রামীণ লোকশিল্প। এ শিল্প আজ লুপ্তপ্রায় হলেও এর কিছু কিছু নমুনা পাওয়া যায়। আপন পরিবেশ থেকেই মেয়েরা তাঁদের মনের মতো করে কাঁথা সেলাইয়ের অনুপ্রেরণা পেতেন। কাঁথার প্রতিটি সুচের ফোঁড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক-একটি পরিবারের কাহিনি, তাদের পরিবেশ, তাদের জীবনগাথা। আমাদের দেশের কুমোরপাড়ার শিল্পীরা মাটি দিয়ে তৈজসপত্র ও বিভিন্ন ধরনের শৌখিন দ্রব্য তৈরি করে থাকে। নানা প্রকার পুতুল, মূর্তি ও আধুনিক রুচির ফুলদানি, ছাইদানি, চায়ের সেট ইত্যাদি তারা গড়ে থাকে। খুলনার মাদুর ও সিলেটের শীতলপাটি সকলের কাছে পরিচিত।
আমাদের দেশের এই যে লোকশিল্প তা সংরক্ষণের দায়িত্ব আমাদের সকলের। লোকশিল্পের মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারি।

Content added By

লেখক-পরিচিতি

251

কামরুল হাসান ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। একজন খ্যাতিমান শিল্পী হিসেবে দেশে-বিদেশে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর আঁকা ছবিতে এদেশের লোকজ্জ জীবনের নানা উপাদান আমাদের ঐতিহ্য-সচেতন করে। লোকশিল্প সংরক্ষণেও তাঁর প্রচেষ্টা ছিল প্রশংসনীয়। কর্মজীবনে তিনি দীর্ঘকাল ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউটে অধ্যাপনার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। পরে তিনি বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ডিজাইন সেন্টারের প্রধান (নকশাবিদ) নিযুক্ত হন। এ সময় তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকশিল্পের নানা উপকরণ সংগ্রহ করেন। ছবি আঁকার বিচিত্র কলাকৌশল এবং লোকশিল্পের নানা দিক সম্পর্কে তাঁর লেখা পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর একটি বইয়ের নাম 'বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলন ও আমার কথা'। ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে কামরুল হাসান ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

Content added By

কর্ম-অনুশীলন

303

ক. তোমার দেখা একটি লোকশিল্পের পরিচয় তুলে ধরো।
খ. বিভিন্ন লোকশিল্পে যেসব চিহ্ন বা প্রতীক দেখতে পাওয়া যায়, বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে তার একটি তালিকা তৈরি করো (দলগত কাজ)।

Content added By

কত কাল ধরে (অষ্টম অধ্যায়) (আনিসুজ্জামান)

3.4k

বাংলাদেশের ইতিহাস প্রায় আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস। হয়তো আরও বেশি সময়ের। এ ইতিহাসের সবটা আজও ভালো করে জানা নেই আমাদের। আলো-আঁধারের খেলায় অনেক পুরানো কথা ঢাকা পড়েছে।

ইতিহাস বলতে শুধু রাজ-রাজড়াদের কথাই বোঝায় না। বোঝায় সব মানুষের কথা। এককালে এদেশে রাজ-রাজড়া ছিল না, তখন মানুষের দাম ছিল বেশি। লোকজন নিজেরাই যুক্তি পরামর্শ করে কাজ করত, চাষ করত, ঘর বাঁধত, দেশ চালাত।

তারপর তেইশ-চব্বিশশ বছর আগে- রাজা এলেন এদেশে। সেই সঙ্গে মন্ত্রী এলেন, সামন্ত-মহাসামন্তের দল এলেন। কত লোক-লস্কর বহাল করা হলো, কত ব্যবস্থা, কত নিয়মকানুন দেখা দিল।
এক কথায় তখন কারো গর্দান যেত, কেউ বড় লোক হয়ে যেত কারও খুশির বদৌলতে। তখন থেকে ইতিহাসে বড় বড় অক্ষরে রাজাদের নাম লেখা হয়ে গেল, আর প্রজারা রইল পেছনে পড়ে।
তবু এদের কথা কিছু কিছু জানা যায়, পরিচয় পাওয়া যায় এদের জীবনযাত্রার।
হাজার বছর আগে সব পুরুষই পরত ধুতি, সব মেয়েই শাড়ি। শুধু সচ্ছল অবস্থা যাদের, তাদের বাড়ির ছেলেরা ধুতির সাথে চাদর পরত, মেয়েরা শাড়ির সাথে ওড়না ব্যবহার করত। এখনকার মতো তখনো মেয়েরা আঁচল টেনে ঘোমটা দিত, শুধু ওড়নাওয়ালিরা ঘোমটা দিত ওড়না টেনে। তবে ধুতি আর শাড়ি দুই-ই হতো বহরে ছোট। তাতে নানা রকম নকশাও কাটা হতো। মখমলের কাপড় পরত শুধু মেয়েরা। নানারকম সূক্ষ্ম পাটের ও সুতোর কাপড়ের চল ছিল। জুতো পরতে পেত না সাধারণ লোকে-শুধু যোদ্ধা বা পাহারাদাররা জুতো ব্যবহার করত। সাধারণে পরত কাঠের খড়ম। ছাতা-লাঠির ব্যবহার ছিল।
সাজসজ্জার দিকে বেশ ঝোঁক ছিল প্রাচীন বাঙালির। চুলের বাহার ছিল দেখবার মতো। বাবরি রাখত ছেলেরা। না হয় মাথার ওপরে চুড়ো করে বাঁধত চুল। এখন মেয়েরা যেমন ফিতে বাঁধে চুলে, তখন শৌখিন পুরুষেরাও অনেকটা তেমনি করে কোঁকড়া চুল কপালের ওপর বেঁধে রাখত। মেয়েরা নিচু করে 'খোঁপা' বাঁধত-নয়তো উঁচু করে বাঁধত 'ঘোড়াচুড়'। কপালে টিপ দিত, পায়ে আলতা, চোখে কাজল আর খোঁপায় ফুল। নানারকম প্রসাধনীও ব্যবহার করত তারা।
মেয়েরা তো বটেই, ছেলেরাও সে বুগে অলংকার ব্যবহার করত। সোনার অলংকার পরতে পেত শুধু বড়লোকেরা। তাদের বাড়ির ছেলেরাও সুবর্ণকুণ্ডল পরত, মেয়েরা কানে দিত সোনার 'তারঙ্গ'। হাতে, বাহুতে, গলায়, মাথায় সর্বত্রই সোনা-মণি-মুক্তো শোভা পেত তাদের মেয়েদের। সাধারণ পরিবারের মেয়েরা হাতে পরত শাঁখা, কানে কচি কলাপাতার মাকড়ি, গলায় ফুলের মালা।
ভাত বাঙালির বহুকালের প্রিয় খাদ্য। সরু সাদা চালের গরম ভাতের কদর সব চাইতে বেশি ছিল বলে মনে হয়। পুরোনো সাহিত্যে ভালো খাবারের নমুনা হিসেবে যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, তা এই: কলার পাতায় গরম ভাত, গাওয়া ঘি, নালিতা শাক, মৌরলা মাছ আর খানিকটা দুধ। লাউ, বেগুন ইত্যাদি তরিতরকারি প্রচুর খেত সেকালের বাঙালিরা, কিন্তু ডাল তখনো বোধহয় খেতে শুরু করে নি। মাছ তো প্রিয় বস্তুই ছিল- বিশেষ করে ইলিশ মাছ। শুটকির চল সেকালেও ছিল-বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে। ছাগমাংস সবাই খেত- হরিণের মাংস বিয়ে বাড়িতে বা এরকম উৎসবেই সাধারণত দেখা যেত। পাখির মাংসও তাই। ক্ষীর, দই, পায়েস, ছানা-এসব ছিল বাঙালির নিত্যপ্রিয়। আম-কাঁঠাল, তাল-নারকেল ছিল প্রিয় ফল। আর খুব চল ছিল খাজা, মোয়া, নাড়ু, পিঠেপুলি, বাতাসা, কদমা এসবের। মশলা দেওয়া পান খেতেও সকলে ভালোবাসত। সাধারণ লোকে মাটির পাত্রেই রান্নাবান্না করত। 'জালা', 'হাঁড়ি', 'তেলানি'- সচরাচর এসব পাত্রের ব্যবহারই করা হতো।

সেকালের পুরুষেরা ছিল শিকারপ্রিয়। কুস্তি খেলারও চল ছিল বেশ। মেয়েরা সাঁতার দিতে ও বাগান করতে ভালোবাসত। মেয়েরা খেলত কড়ির খেলা-ছেলেরা দাবা আর পাশা। বড়লোকরা ঘোড়া আর হাতির খেলা দেখত। যাদের সে ক্ষমতা ছিল না, তারা ভেড়ার লড়াই আর মোরগ-মুরগির লড়াই বাঁধিয়ে দিত।
নাচগানের বেশ প্রসার ছিল। বীণা, বাঁশি, কাড়া, ছোটডমরু, ঢাক-এসব বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ছিল।
যাতায়াতের প্রধান উপায় ছিল নৌকা। হাতির পিঠে ও ঘোড়া-গাড়িতে চড়ত শুধু অবস্থাপন্ন লোকেরা। গরুর গাড়ি সাধারণ লোকে ব্যবহার করত-তবে সব সময় নয়-বিশেষ উপলক্ষে। মেয়েরা 'ডুলি'তে চড়ত। পালকির ব্যবহারও ছিল। বড় লোকদের পালকি হতো খুব সাজানো-গোছানো, রাজবাড়িতে হাতির দাঁতের পালকিও থাকত।
বেশির ভাগ লোকই থাকতো কাঠ-খড়-মাটি-বাঁশের বাড়িতে। বড় লোকেরাই শুধু ইট-কাঠের বাড়ি করত।
ওপরের বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার বলতে হয়েছে সকলে এক রকম ছিল না। কেননা, সেই পুরোনো কাল আর নেই, যখন সবাই মিলে মিশে কাজ করত। রাজা এসে গেছেন সমাজে। তাই কেউ প্রভু, কেউ ভৃত্য। কেউ প্রভুর প্রভু, কেউ দাসের দাস! দুজন প্রাচীন সংস্কৃত কবির রচনায় তাই এমন দুটি ছবি পাওয়া যায়-সে দুটো ছবি যে একই দেশের, সে কথা মনে হয় না। একজন দিয়েছেন মেয়েদের বর্ণনা: কপালে কাজলের টিপ, হাতে চাঁদের কিরণের মতো সাদা পদ্মবৃন্তের বালা ও তাগা, কানে কচি রিঠা ফলের দুল, স্নানস্নিগ্ধ কেশে তিলপল্লব।
আরেকজন এঁকেছেন সংসারের ছবি:
নিরানন্দে তার দেহ শীর্ণ, পরনে ছেঁড়া কাপড়। ক্ষুধায় চোখ আর পেট বসে গেছে শিশুদের, যেন এক মণ চালে তার একশ দিন চলে যায়।
রাজাদের দল এখন আর নেই। মৌর্য-গুপ্ত, পাল-সেন, পাঠান-মুঘল, কোম্পানি-রানি এদের কাল শেষ হয়েছে। আজকের দুই কবিও হয়তো দুই প্রান্তে বসে এমনি করে কবিতা লিখছেন। একজন লিখছেন সমৃদ্ধির কথা, বিলাসের কথা, আনন্দের কথা। আরেকজন ছবি আঁকছেন নিদারুণ অভাবের, জ্বালাময় দারিদ্র্যের, অপরিসীম বেদনার। সরু চালের সাদা গরম ভাতে গাওয়া ঘি-কত কাল ধরে কত মানুষ শুধু তার স্বপ্নই দেখে আসছে।

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও

তোমরা আলতা পরিও না, শাড়ি পরিও না, আলতা শাড়ি পরিলে মনে পইড়া যায়, একদিন বাঙালি ছিলাম রে ..........

কতদিকে কত কারিগর
তোলপাড়
মাদার তেরেসা
কতকাল ধরে
শুধু রাজরাজড়াদের কথা
অভিজাতদের কথা
প্রতিভাবান মানুষের কথা
সব মানুষের কথা
বাংলা একাডেমি ও একুশে পদক
একুশে ও ইউনেস্কো
বাংলা একাডেমি ও একুশে পদক
দাউদ পুরস্কার ও ইউনেস্কো

শব্দার্থ ও টীকা

364

সামন্ত - রাজা-বাদশার অধীনে ছোট রাজা। অনেক ভূমির মালিক।
লোক-লস্কর - সেনাবাহিনী ও এদের সঙ্গের লোকজন।
গর্দান যেত - মাথা কাটা যেত।
বদৌলতে - প্রভাবে। দয়ায়।
ঘোড়াচূড় - এক ধরনের খোঁপা।
সুবর্ণকুণ্ডল - সোনা দিয়ে তৈরি মোটা চুড়ির মতো গোলাকার অলংকার।
তারঙ্গ - কানে পরার দুল বা অলংকার।
মাকড়ি - এক প্রকার দুল।
ডুলি - পালকির মতো ছোট বাহন।
পদ্মবৃত্ত - পদ্ম ফুলের বোঁটা।
তাগা - বাহুতে পরার অলংকার। মাদুলি। তাবিজ বা তার সুতো।
স্নানস্নিগ্ধ - গোসল সেরে পরিষ্কার ও কোমল হয়েছে এমন।
তিলপল্লব - তিলের নতুন পাতা।
নিরানন্দ - আনন্দহীন। বিষণ্ণ। অসুখী।
শীর্ণ - কৃশ। ক্ষীণ। রোগা।

Content added By

পাঠের উদ্দেশ্য

293

দেশ ও জাতির ইতিহাস ও জীবনযাত্রার ধারাবাহিক পরিবর্তন সম্পর্কে জানা।

Content added By

পাঠ-পরিচিতি

298

বাংলাদেশের ইতিহাস আড়াই হাজার বছর বা তারও বেশি সময়ের পুরোনো। ইতিহাসে থাকে সব রকমের মানুষের জীবনযাত্রার পরিচয়। এককালে বাংলাদেশে রাজার শাসন ছিল না, লোকজন নিজেরাই মিলে-মিশে যুক্তি-পরামর্শ করে দেশ চালাত। তেইশ-চব্বিশ-শ বছর আগে রাজ-রাজড়ার শাসন শুরু হলো প্রাচীনকালে পুরুষেরা পরত ধুতি-চাদর, আর মেয়েরা শাড়ি-ওড়না। সাধারণ লোকের জুতা পরার সামর্থ্য ছিল না, তারা পরত কাঠের খড়ম। পুরোনো দিনেও এ দেশের মানুষের সাজগোজের দিকে নজর ছিল। সোনার অলংকার পরার সুযোগ পেত শুধু ধনীরা। মাছ-ভাত-তরিতরকারি-দুধ-ঘি ইত্যাদি ছিল সেকালের বাঙালির প্রিয় খাদ্য। ইলিশ মাছ ছিল বেশি প্রিয়।

কুস্তি ছিল সেকালের পুরুষদের অত্যন্ত প্রিয় খেলা, নারীদের ছিল সাঁতার। ধনীরা দেখত ঘোড়া ও হাতির খেলা, গরিবরা মজা পেত ভেড়ার লড়াই, মোরগ-মুরগির লড়াই দেখে।
জলপথই ছিল যাতায়াতের প্রধান পথ, তবে স্থলপথও ছিল। বেশির ভাগ লোকই থাকত কাঁচাবাড়িতে। লেখক- কবিদের কেউ কেউ লিখতেন আনন্দ ও সমৃদ্ধির কথা, কারো কারো লেখায় থাকত বেদনা ও দারিদ্র্যের ছবি। সেকালে রাজ-রাজড়া ছিল, এখন নেই। কিন্তু ধনী-দরিদ্র এখনও আছে। সেকালেও সাধারণ মানুষ স্বপ্ন দেখতো সরু চালের সাদা গরম ভাতের। একালেও তারা তাই দেখছে।

Content added By

লেখক-পরিচিতি

277

মননশীল প্রাবন্ধিক ও গবেষক আনিসুজ্জামানের জন্ম ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে, কলকাতায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরিটাস অধ্যাপক ছিলেন।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে তাঁর বেশ কিছু গবেষণাগ্রন্থ রয়েছে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো: 'মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য', 'মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র', 'মুনীর চৌধুরী', 'স্বরূপের সন্ধানে', 'পুরনো বাংলা গদ্য'। এ ছাড়া তিনি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত 'বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস' গ্রন্থের প্রধান সম্পাদক।
সাহিত্য-সাধনা ও গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বিভিন্ন পুরস্কার ও পদকে ভূষিত হন। এগুলো হচ্ছে: দাউদ পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, পদ্মভূষণ (ভারত) ইত্যাদি। তিনি ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেণ।

Content added By

কর্ম-অনুশীলন

352

১. ভিন্ন ভিন্ন পাঁচটি পেশার মানুষের জীবনযাপনের বর্ণনা কর।
২. একক বা দলগতভাবে তোমার স্কুলের ইতিহাস রচনা কর।
৩. দাদা-দাদি, পিতা-মাতা, চাচা-ফুপু ও ভাই-বোনের সহায়তায় তোমার পরিবারের ইতিহাস রচনা কর।

Content added By

কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও পোস্টারের ভাষা (নবম অধ্যায়) ((সংকলিত))

4.4k

আমরা নানাভাবে মতপ্রকাশ করি। কথা বলে, লিখে, ছবি এঁকে, গান গেয়ে আরো অনেক উপায়ে আমরা মনের ভাব প্রকাশ করতে পারি। কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও পোস্টার এরকম কয়েকটি মাধ্যম। এগুলো নির্মল হাসির উপাদান হতে পারে, আবার হাসির মাধ্যমে সমাজের নানা অসংগতিও প্রকাশ করা যায়। শুধু তাই নয়, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেও কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও পোস্টার ব্যবহার করা হয়। পৃথিবীর কোনো দেশে যখন বড়ো আন্দোলন হয়, তখন চিত্রশিল্পীরা কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও পোস্টার আঁকার মাধ্যমে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। এগুলোকে বলা যায় রাজনৈতিক কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র বা পোস্টার। এগুলো আন্দোলনে শক্তি জোগায় এবং মানুষকে আরো উজ্জীবিত করে।

অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও অনেক বড়ো বড়ো আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে, গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। নানা শ্রেণি-পেশা আর মতের মানুষ নেমে এসেছে রাস্তায়। তখন আমাদের চিত্রশিল্পীরাও এগিয়ে এসেছেন। তাঁরা মিছিল-মিটিং করেছেন, অন্যদের সাথে নানা কর্মসূচি পালন করেছেন। তবে অন্যদের চেয়ে আলাদা একটা কাজও করেছেন তাঁরা কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও পোস্টার এঁকে আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছেন।

একটা কার্টুনের ছোট্ট ছবিতে প্রতিবাদের বা বিদ্রোহের যে প্রকাশ ঘটে, অনেক সময় হাজার কথায় তা প্রকাশ করা যায় না। অনেক সময় কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র বা পোস্টারের ছবি আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে। বহু মানুষ তাতে মনের ভাষা খুঁজে পায়। আন্দোলন গড়ে ওঠার জন্য সেগুলো শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বারবার এটা দেখা গেছে। এসব আন্দোলন-সংগ্রামে বহু কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও পোস্টার আঁকা হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সারা দেশের দেয়ালে দেয়ালে অসংখ্য গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় শেখ তোফাজ্জল হোসেনের আঁকা একটি কার্টুনে দেখা যায়, একটি গরু ঘাস খাচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানে, কিন্তু তার দুধ চলে যাচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানে। তখন আমাদের দেশের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। আমাদের দেশকে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা শোষণ করতো। শোষণের কথাটা তিনি এভাবে প্রকাশ করেছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় নিতুন কুণ্ডুর আঁকা একটি পোস্টার 'সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী' বিভিন্ন স্থানে লাগানো দেখলে সাধারণ মানুষ আশার আলো দেখতে পেত, আর পাকিস্তানি সৈন্যরা ভয় পেত।

১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের আগে 'দেশ আজ বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে' শিরোনামে একটা ব্যঙ্গচিত্র এঁকেছিলেন পটুয়া কামরুল হাসান। সেটা তখন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। একটি ছবি আর একটিমাত্র বাক্য দেশের মানুষের জন্য অসাধারণ প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিল।

গণবিরোধী শাসকেরা কার্টুন আঁকার জন্য অনেক সময় শিল্পীদের নির্যাতন করে, জেলখানায় বন্দি করে রাখে, এমনকি হত্যাও করে। এইসব ভয়ভীতি উপেক্ষা করেও অনেক চিত্রশিল্পী ছবি ও কার্টুন আঁকেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে একটি কার্টুনের শিরোনাম লিখেছিলেন বলে লেখক মুশতাক আহমেদকে জেলখানায় নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানের সময় চিত্রশিল্পী দেবাশিস চক্রবর্তী অনেক কার্টুন ও পোস্টার এঁকেছেন। এগুলো গণঅভ্যুত্থানের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

তবে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে নাম-না-জানা শিল্পীরাই সবচেয়ে বেশি কার্টুন আর ব্যঙ্গচিত্র এঁকেছেন। আন্দোলন চলার সময়ে এঁকেছেন, আন্দোলনের পরেও এঁকেছেন। সবচেয়ে বেশি এঁকেছেন সারাদেশের দেয়ালে। এগুলোকে গ্রাফিতি বলা হয়। এর পাশাপাশি শিল্পীরা বিপুল ব্যঙ্গচিত্র ও মিম প্রচার করেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। স্বৈরশাসক সবার মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল, কিন্তু কার্টুন-ব্যঙ্গচিত্র আর পোস্টার-মিমের মধ্য দিয়ে তার বিরুদ্ধে কথা বলা সম্ভব হয়েছিল। সারা দেশের দেয়াল জুড়ে আঁকা অসংখ্য গ্রাফিতি হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের ভাষা।

তাই আমাদের মনে রাখতে হবে, অন্যায়ের প্রতিবাদ শুধু লিখে বা কথা বলে নয় ছবি এঁকে, গান গেয়ে, এমনকি নৃত্য করেও করা যায়। এদেশের মানুষ যুগে যুগে নানা আন্দোলন-সংগ্রামে এমন প্রতিবাদ করেছেন। এইসব কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও পোস্টার তাই আমাদের ইতিহাসের সম্পদ। এগুলো আন্দোলনের স্মৃতি ধরে রাখবে, নতুন দিনের নতুন প্রয়োজনে আমাদের নতুনভাবে জাগিয়ে তুলবে।

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও

বাংলাদেশে স্বৈরাচারের শাসনের সময় একজন শিল্পী শোষণের দিকগুলো মানুষকে জানাতে একটি গান লেখেন ও গেয়ে প্রচার করেন। পরে স্বৈরাচার সরকারের নির্দেশে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

উদ্দীপকটি দেখে প্রশ্নের উত্তর দাও
উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও

শব্দার্থ ও টীকা

383

ব্যঙ্গচিত্র - বিশেষ ধরনের কার্টুন।
গণঅভ্যুত্থান - সর্বস্তরের মানুষের যে আন্দোলনের মুখে স্বৈরশাসকরা ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বা দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়।
গ্রাফিতি - দেয়ালে আঁকা, লেখা বা ছবি, যা শোষকের বিরুদ্ধে জনতার মনের ভাব প্রকাশ করে।
স্বৈরাচার - স্বেচ্ছাচার, ইচ্ছামত আচরণ।
খপ্পর - ফাঁদ, কবল।
পটুয়া - পটচিত্র আঁকে যে, চিত্রকর।

Content added By

পাঠের উদ্দেশ্য

349

লেখাটি পাঠ করে শিক্ষার্থীরা গণবিরোধী শাসকের বিরুদ্ধে শিল্পীদের প্রতিবাদের ভাষা সম্পর্কে জানতে পারবে। কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র, পোস্টার ও গ্রাফিতির মতো শৈল্পিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও পরিচিত হতে পারবে।

Content added By

পাঠ-পরিচিতি

286

শাসকশ্রেণি যখন স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে তখন সকল শ্রেণির মানুষের মতো চিত্রশিল্পীদের মনেও বিদ্রোহ জাগে। জনতার সঙ্গে মিছিল-সমাবেশে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও পোস্টার আঁকার মাধ্যমে তাঁরা গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের এ সকল চিত্রকর্ম আন্দোলনে শক্তি যোগায় এবং মানুষকে সামাজিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চেতনায় উজ্জীবিত করে তোলে। বাংলাদেশের নিকট-ইতিহাসে তিনটি গণঅভ্যুত্থান সংঘঠিত হয়েছে প্রথমটি ১৯৬৯ সালে, দ্বিতীয়টি ১৯৯০ সালে এবং তৃতীয়টি ২০২৪ সালে। প্রতিটি আন্দোলনেই শিল্পীরা শৈল্পিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে তারা বিভিন্নরকম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। চিত্রশিল্পীদের এসব সৃষ্টি ইতিহাসের স্মৃতি যেমন ধরে রাখবে, তেমনি ভবিষ্যতের সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রেরণা হিসেবেও কাজ করবে।

Content added By

কর্ম-অনুশীলন

326

ক. কামরুল হাসানকে কেন 'পটুয়া' বলা হয়?
খ. ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের তিনটি গ্রাফিতির বর্ণনা দাও।
গ. উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় শেখ তোফাজ্জল হোসেনের আঁকা কার্টুনটির বক্তব্য কী ছিল?

Content added By
Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...